জাতীয় নির্বাচনের দামামা বাজার অপেক্ষার মধ্যেই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থার সামনে বড় এক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে অবৈধ অস্ত্র। বিশেষ করে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানকালীন থানা ও কারাগার থেকে লুট হওয়া কয়েক হাজার অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র এখনো উদ্ধার না হওয়ায় জনমনে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যমতে, লুট হওয়া অস্ত্রের প্রায় ৩০ শতাংশ এখনো রয়ে গেছে লোকচক্ষুর অন্তরালে, যা আসন্ন নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক সহিংসতা কিংবা ‘টার্গেট কিলিং’ (Target Killing)-এর মতো ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করছে।
পরিসংখ্যানের ভয়াবহতা: কী আছে সেই ৩০ শতাংশে?
পুলিশ সদর দপ্তরের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করলে এক শিউরে ওঠার মতো চিত্র ফুটে ওঠে। গণঅভ্যুত্থানের সময় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মোট ৫ হাজার ৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং প্রায় সাড়ে ৬ লাখ রাউন্ড গোলাবারুদ লুট হয়েছিল। ২০২৬ সালের জানুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত ৪ হাজার ৪৩১টি অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হলেও এখনো ১ হাজার ৩৩২টি মারণাস্ত্র নিখোঁজ।
উদ্বেগের মূল কারণ নিখোঁজ অস্ত্রের ধরন। এখনো উদ্ধার না হওয়া তালিকার মধ্যে রয়েছে ১১৪টি চাইনিজ রাইফেল, ৩১টি চাইনিজ এসএমজি (SMG), ২০৭টি ৭.৬২ এমএম পিস্তল, ৪৫৫টি ৯ এমএম পিস্তল এবং ৩৯৩টি শটগান। এসব ‘স্মল আর্মস’ (Small Arms) বা ছোট আগ্নেয়াস্ত্রগুলো অপরাধীদের কাছে বহনযোগ্য এবং ব্যবহারের জন্য অত্যন্ত সুবিধাজনক, যা বর্তমান আইনশৃঙ্খলার জন্য বড় ধরনের থ্রেট।
‘টার্গেট কিলিং’ ও আধুনিক অস্ত্রের দাপট
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশে চাঞ্চল্যকর বেশ কিছু হত্যাকাণ্ড ও দুঃসাহসিক ডাকাতির ঘটনায় আগ্নেয়াস্ত্রের অবাধ ব্যবহার লক্ষ্য করা গেছে। কয়েক সপ্তাহ আগে সেনাবাহিনীর ৯ম পদাতিক ডিভিশন জার্মানির তৈরি একটি অত্যাধুনিক পিস্তল উদ্ধার করে, যা অপরাধীদের হাতে থাকা অস্ত্রের আধুনিকায়নেরই ইঙ্গিত দেয়। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, লুট হওয়া অস্ত্রের একটি বড় অংশ এখন পেশাদার খুনি বা রাজনৈতিক ক্যাডারদের হাতে চলে গেছে।
অস্ত্রের এই সহজলভ্যতা কেবল সাধারণ অপরাধই বাড়াচ্ছে না, বরং আসন্ন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যেও এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছে।
পুলিশের পরিকল্পনা ও পুরস্কারের হাতছানি
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অবশ্য বলছে, তারা হাত গুটিয়ে বসে নেই। পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানিয়েছেন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার তাদের জন্য বর্তমানে সর্বোচ্চ ‘প্রায়োরিটি’ (Priority)।
তিনি বলেন, “আমরা আমাদের গোয়েন্দা নজরদারি (Intelligence Surveillance) আরও জোরদার করেছি। নিয়মিত অভিযানের পাশাপাশি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে সাধারণ জনগণকে সম্পৃক্ত করতে পুরস্কার ঘোষণার মতো পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে। আমাদের বিশ্বাস, নির্বাচনের আগেই অস্ত্রের একটি বড় অংশ উদ্ধার করা সম্ভব হবে।” তবে পুলিশের এই আশ্বাসের বিপরীতে মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান অগ্রগতির অভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকেই।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের চোখে ‘অস্তিত্বের সংকট’
পুলিশের দাবি ও আশ্বাসে পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারছেন না অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. তৌহিদুল হক মনে করেন, কেবল নামমাত্র অভিযান দিয়ে এই সংকট দূর করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, “যারা অস্ত্রগুলো ব্যবহার করে টার্গেট কিলিং করছে, তারা হয়তো সরাসরি লুট করেনি। এর পেছনে যারা পৃষ্ঠপোষক বা সুবিধাভোগী রয়েছে, তাদের আইনের আওতায় আনা জরুরি।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচনের আগে যদি এই বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার না হয়, তবে ভোটকেন্দ্রের দখল থেকে শুরু করে প্রার্থী হত্যা—যেকোনো অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থেকেই যায়। এছাড়া গত আগস্টের পর পুলিশ বাহিনীর মনোবলে যে চিড় ধরেছে, তা পুনরুদ্ধার না করলে মাঠপর্যায়ে কঠোর অভিযান পরিচালনা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
নির্বাচনের অনুকূল পরিবেশ বজায় রাখতে হলে কেবল ‘লুট হওয়া’ অস্ত্রই নয়, বরং সীমান্তের ওপার থেকে আসা অবৈধ অস্ত্রের চোরাচালান বন্ধেও বিজিবি ও র্যাবকে আরও বেশি তৎপর হতে হবে। অন্যথায়, ভোটের মাঠে ব্যালটের চেয়ে বুলেটের শব্দ বেশি হওয়ার যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত হয়েই থাকবে।