• বিনোদন
  • কলকাতার সেই শীতের সকালে স্তব্ধতা! মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের শেষ ২৬ দিন ও চিরবিদায়ের অদেখা আখ্যান

কলকাতার সেই শীতের সকালে স্তব্ধতা! মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের শেষ ২৬ দিন ও চিরবিদায়ের অদেখা আখ্যান

বিনোদন ১ মিনিট পড়া
কলকাতার সেই শীতের সকালে স্তব্ধতা! মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের শেষ ২৬ দিন ও চিরবিদায়ের অদেখা আখ্যান

২০১৪ সালের ১৭ জানুয়ারি—মিন্টো পার্কের হাসপাতাল চত্বর কীভাবে পরিণত হলো এক শোকস্তব্ধ তীর্থক্ষেত্রে? এক এডিটর-এর চোখ দিয়ে সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের আবেগঘন প্রতিবেদন।

২০১৪ সালের জানুয়ারি মাস। কলকাতায় শীতের তীব্রতা ছিল রেকর্ড ছুঁয়ে। ভোরে রাস্তা থাকত কুয়াশাচ্ছন্ন, দোকানপাট খুলত দেরিতে। কিন্তু আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু রোডের ধারে ছোট্ট, অথচ প্রখ্যাত হাসপাতাল—বেল ভিউ—তার সামনে ছবিটা ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। মিন্টো পার্কের এই চত্বর যেন প্রতিদিনই তৈরি করছিল অন্য এক কলকাতা। সাধারণ মানুষ, সংবাদকর্মী, ক্যামেরা, ট্রাইপড—সব মিলিয়ে এক অভূতপূর্ব জমায়েত। সবাই জানত ভেতরে কে আছেন। তাঁর নাম উচ্চারণ না করেও সবাই বলত—‘দিদি’, কেউ বলতেন ‘মিজ সেন’ বা ‘ম্যাডাম সুচিত্রা’।

এক দীর্ঘ জার্নালিস্টিক কভারেজ-এর দিনগুলিতে নির্দিষ্ট সীমানার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা হাজারো মানুষের চোখ থাকত হাসপাতালের দরজায়। কোনো নার্স বাইরে এলেই সম্মিলিত প্রশ্ন একটাই, “এখন কেমন আছেন দিদি?” কখনো সংক্ষিপ্ত উত্তর মিলত, কখনো মিলত না কিছুই। সেই না–পাওয়া উত্তরই ছিল সবচেয়ে ভারী।

ছাব্বিশ দিনের লড়াই: গোপনীয়তার দুর্গে

হাসপাতালে ভর্তির প্রথম দিন থেকেই শুরু হয়েছিল এই নিবিড় অনুসরণ। ভেতরে খবর পৌঁছানো ছিল অসম্ভব কঠিন। স্থানীয় এক বন্ধুর সূত্রে একজন নার্সের সঙ্গে পরিচয় হয়। শর্ত ছিল একটাই—পরিচয় প্রকাশ করা যাবে না, কারণ তাতে চাকরি যেতে পারে।

তাঁর মুখেই শোনা গেছে ভেতরের কড়াকড়ির গল্প। মহানায়িকার ইচ্ছাতেই তাঁর পরিচর্যার দায়িত্বে থাকা তিনজন নার্সের ছুটি বাতিল করা হয়েছিল। সুচিত্রা সেন পরিচিত মুখ ছাড়া অন্য কাউকে দেখলে বিরক্ত হতেন, অনেক সময় চিকিৎসা নিতেও চাইতেন না।

শেষ ২৬টি দিন হাসপাতালের প্রতিটি বিভাগ—কার্ডিওলজি, পালমোনোলজি, ক্রিটিক্যাল কেয়ার—যেন এক নামেই শ্বাস নিচ্ছিল—সুচিত্রা সেন। এটি কেবল চিকিৎসা ছিল না, ছিল এক ইতিহাসকে ধরে রাখার লড়াই। সবার দৌড়ঝাঁপ, দৃষ্টি এবং উৎকণ্ঠা দেখলেই তা স্পষ্ট বোঝা যেত।

সংবাদ ও উত্তেজনার দ্বন্দ্ব

সেসময় সকলেরই নিজস্ব কিছু সূত্র ছিল, তবে সবচেয়ে বড় ভরসা ছিল হাসপাতালের পক্ষ থেকে দেওয়া মেডিক্যাল বুলেটিন। দিনে একাধিকবার নিয়ম করে শারীরিক অবস্থার খবর জানানো হতো। টেলিভিশনের লাইভ রিপোর্ট-এ কখনো শোনা যেত ‘স্থিতিশীল’, আবার কিছুক্ষণের মধ্যেই ‘আশঙ্কাজনক’। এই সাংঘর্ষিক খবরই শহরের উৎকণ্ঠা আরও বাড়িয়ে তুলছিল।

চ্যানেল আর পত্রিকার রিপোর্টার ও ভিডিও টিম নিজেদের জায়গা নির্দিষ্ট করে নিয়েছিল। কাজের চাপে অনেকের অবস্থাই যেন তাঁবু গেড়ে থাকার মতো। কেউ গাড়িতে রাত কাটিয়েছেন, কেউ হাসপাতালের পাশের ছোট্ট পার্কে। সংবাদকর্মী-দের মধ্যেও তখন একধরনের নীরব সমঝোতা তৈরি হয়েছিল—এটা আর শুধু সংবাদ নয়, এটা এক আবেগের কভারেজ।

১৭ জানুয়ারির সকাল: এক যুগের সমাপ্তি

সেদিন ছিল শুক্রবার। সকাল সাতটা নাগাদই গুঞ্জন ছড়াতে শুরু করে—অবস্থা আবার খারাপ। আগের দিন খবর ছিল, শরীর সামান্য ভালো, এমনকি বাড়ি ফেরার প্রস্তুতিও চলছিল। কিন্তু ভোরের দিকে হঠাৎই সংকট ঘনিয়ে আসে। হাসপাতালের ভেতর থেকে নানা রকম খবর আসতে থাকে। মিডিয়া-তে শুরু হয় লাইভ সম্প্রচার-এর প্রস্তুতি। অথচ মনে হচ্ছিল, কেউই যেন প্রস্তুত নন, কারণ ‘সুচিত্রা যেন মারা যেতে পারেন না’।

একসময় শোনা যায়, পালস রেট একদম কমে এসেছে। শহরের ভেতর তখন একটাই প্রশ্ন—তাহলে কি শেষ?

সকাল আটটার কিছু পর হৃৎস্পন্দন বন্ধ হয়ে যায়। ডাক্তারি ভাষায়—ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক। ভেতরে তখন মেয়ে মুনমুন সেন মায়ের কানের কাছে মুখ নিয়ে ডেকে চলেছেন, ‘মা, মা’। নাতনি রাইমার কান্না থামছে না। সব চেষ্টা ব্যর্থ করে সকাল ৮টা ২৫ মিনিটে চলে গেলেন মহানায়িকা সুচিত্রা সেন।

হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কথা বলতে বলতে মুখ্যমন্ত্রী নিজেও আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন। সেই কান্না মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। সবারই এক অনুরোধ ছিল—‘একবার দেখতে চাই দিদিকে।’ কিন্তু সুচিত্রার জীবনের মতোই তাঁর শেষযাত্রার গোপনীয়তাও ছিল বজায়।

কেওড়াতলার পথে: নিঃশব্দ শোকযাত্রা

মিন্টো পার্কের রাস্তা সকাল থেকেই নিয়ন্ত্রিত ছিল। সাইরেন-এর শব্দ কনকনে শীতের বাতাস চিরে দিচ্ছিল, যেন শহর নিজেই জানিয়ে দিচ্ছে—আজ কিছু একটার জন্য থেমে আছে কলকাতা।

বেলুর মঠ থেকে আসা তিন সন্ন্যাসী সুচিত্রার গলায় পরিয়ে দেন শ্রীরামকৃষ্ণের প্রসাদি মালা। সেই মুহূর্তে হাসপাতাল চত্বরে নেমে আসে একধরনের স্তব্ধতা। শববাহী গাড়িতে তোলার আগে কেবিনেই পরানো হয় শেষযাত্রার পোশাক—সাদা বেনারসি, সোনালি গরদের চাদর, মাথায় ঘোমটা। কফিন বন্ধ, ফুলে ঢাকা। গাড়ি এগোতেই রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো নীরবে হাতজোড় করেন। কেউ ফুল ছিটিয়ে দেন, কেউ ফোঁপাচ্ছিলেন নিঃশব্দে। ভিড়ের মধ্যেই ভেসে আসছিল চাপা স্বর, ‘আর এমন কাউকে পাব কি আমরা?’ ‘এই তো আমাদের শৈশব…।’

বালিগঞ্জের ‘বেদান্ত’ নামের বাড়িতে নিয়ম রক্ষার জন্য মিনিট কয়েক রাখার পর শববাহী গাড়ি রওনা দেয় কেওড়াতলার মহাশ্মশানের পথে। রাস্তাজুড়ে যেন এক নিঃশব্দ শোকযাত্রা—কোথাও স্লোগান নেই, কোথাও উচ্চস্বরে কান্না নয়, শুধু চাপা দীর্ঘশ্বাস আর চোখের জল। বেলা ১টা ৪০ মিনিটে মুনমুনের হাতে মুখাগ্নি সম্পন্ন হয়। আগুন জ্বলার সঙ্গে সঙ্গে ভিড়ের ভেতর থেকে হঠাৎ ফুঁপিয়ে ওঠার শব্দ শোনা যায়।

চলে যাওয়ার পরের কলকাতা: স্মৃতির নস্টালজিয়া

১৮ জানুয়ারি, শনিবার। এক রাতেই শহরের রং বদলে গিয়েছিল। কলকাতার আগ্রহ তখন কেবল সুচিত্রা সেনকে ঘিরে। পাড়া-মহল্লা, ক্লাব, চায়ের দোকান—সবখানেই সাদাকালো প্রতিকৃতি। ছবির নিচে ফুল, কোথাও ছোট প্রদীপ জ্বলছে। শহর যেন নিজের মতো করেই শোক পালন করছিল—কোনো ঘোষণা ছাড়াই।

নিউমার্কেটের পানের দোকানে, যেখানে বছরভর মোহাম্মদ রফির গান বাজত, সেখানে ভেসে আসছিল সুচিত্রার ঠোঁটে স্থান পাওয়া সিনেমার গান। ভিডিও–সিডি-র দোকানগুলোতে হঠাৎ করেই পুরোনো ছবির খোঁজ বেড়ে যায়—‘সপ্তপদী আছে?’ ‘হারানো সুর?’

মৃত্যুর পরের কয়েক দিন বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের ‘বেদান্ত’ নামের বাড়িটি হয়ে উঠেছিল এক সংবাদের কেন্দ্রবিন্দু। সাধারণ মানুষের প্রবেশ ছিল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। গেটের সামনে সারাক্ষণ পুলিশ ও সিকিউরিটি স্টাফ। ভেতরে কাউকে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছিল না—তাঁর জীবনের মতোই মৃত্যুর পরের পরিসরেও ছিল সেই চেনা গোপনীয়তা।

জীবনে যাঁর কাছে ফুল পৌঁছানো ছিল প্রায় অসম্ভব—মৃত্যুর পর সেই ফুলই পৌঁছে যাচ্ছিল তাঁর ঘরের কাছাকাছি। ফুলে ফুলে ভরে উঠেছিল বাড়ির বাইরের দেয়াল, গেট আর রাস্তা।

সুচিত্রা সেন কেবল একজন অ্যাকট্রেস ছিলেন না, তিনি ছিলেন স্মৃতির নাম, এক অধ্যায়। তিনি ছিলেন এমন এক নস্টালজিয়া, যাকে মানুষ নিজের কৈশোর, যৌবন আর প্রথম ভালোবাসার সঙ্গে জড়িয়ে রেখেছে। তাঁর চলে যাওয়া মানে শুধু একজন মানুষের মৃত্যু নয়—একটা যুগের নিঃশব্দ বিদায়। এত দিন লোকচক্ষুর আড়ালে থেকেও, তাঁর উপস্থিতি কখনো ফুরোয়নি মানুষের স্মৃতি থেকে। আর হয়তো সেই না–থাকাটাই সুচিত্রা সেনের সবচেয়ে বড় উপস্থিতি।

Tags: bengali cinema death anniversary kolkata news suchitra sen mahanayika suchitra sen death bell vue clinic mounmoun sen nostalgia suchitra uttam