ইরানের রাজনৈতিক আকাশে কি তবে বড় কোনো পরিবর্তনের মেঘ জমছে? মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক এক মন্তব্যে সেই জল্পনা এখন তুঙ্গে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির দীর্ঘ ৩৭ বছরের শাসনের অবসান চেয়ে ট্রাম্প সাফ জানিয়েছেন, ইরানে এখন নতুন নেতৃত্ব খোঁজার সময় এসেছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরানে চলা সরকারবিরোধী বিক্ষোভে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানির ঘটনায় তেহরানের কঠোর দমনপীড়নের কড়া সমালোচনা করে এই বিস্ফোরক মন্তব্য করেন তিনি।
‘অসুস্থ মানুষ’ ও নেতৃত্বের ব্যর্থতা
শনিবার (১৭ জানুয়ারি) মার্কিন সংবাদমাধ্যম 'পলিটিকো' (Politico)-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তার কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেন। সাক্ষাৎকারে তাকে খামেনির বেশ কিছু সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট পড়ে শোনানো হয়, যেখানে বিক্ষোভের জন্য ট্রাম্পকে সরাসরি দায়ী করেছিলেন ইরানি নেতা।
এর জবাবে ট্রাম্প অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভাষায় বলেন, “ইরানে নতুন নেতৃত্ব খোঁজার সময় এসেছে। খামেনি একজন অসুস্থ মানুষ। তার উচিত নিজের দেশটা ঠিকভাবে চালানো এবং নির্বিচারে মানুষ হত্যা বন্ধ করা।” ট্রাম্পের মতে, খামেনি কেবল ক্ষমতায় টিকে থাকার নেশায় পুরো দেশকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছেন এবং আধুনিক বিশ্বে নজিরবিহীন সহিংসতা ব্যবহার করছেন।
ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অপরাধের অভিযোগ
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আরও অভিযোগ করেন যে, ইরানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী সম্পূর্ণভাবে দমন-পীড়ন ও সহিংসতার ওপর নির্ভর করে টিকে আছে। তিনি বলেন, “একজন নেতা হিসেবে খামেনি যে অপরাধ করেছেন, তা হলো নিজ দেশের জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা। তার নেতৃত্বের চরম ব্যর্থতার কারণেই আজ ইরান বিশ্বের অন্যতম বসবাসের অযোগ্য স্থানে পরিণত হয়েছে।” ট্রাম্পের এই বক্তব্যকে বিশ্লেষকরা ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সরাসরি হস্তক্ষেপ বা ‘Regime Change’-এর একটি পরোক্ষ ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।
তেহরানের পাল্টা তোপ: ট্রাম্প একজন ‘ক্রিমিনাল’
এদিকে ট্রাম্পের এই মন্তব্যের আগেই আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি মার্কিন প্রেসিডেন্টের তীব্র সমালোচনা করেন। খামেনির মতে, ইরানে চলমান অস্থিরতা ও রক্তপাতের মূল হোতা স্বয়ং ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানি সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি অনুযায়ী, খামেনি ট্রাম্পকে একজন ‘ক্রিমিনাল’ বা অপরাধী হিসেবে অভিহিত করেছেন।
খামেনি অভিযোগ করেন, এবারের বিক্ষোভ আগের সব আন্দোলনের চেয়ে আলাদা ছিল, কারণ এতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট সরাসরি জড়িত হয়েছেন। তার দাবি, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মদদপুষ্ট গোষ্ঠীগুলো ইরানে ব্যাপক ভাঙচুর ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে, যার ফলে গত দুই সপ্তাহে দেশটিতে কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তেহরানের অভিযোগ, এই অস্থিরতার পেছনে ওয়াশিংটনের সুদূরপ্রসারী ‘Geopolitical Strategy’ কাজ করছে।
বিক্ষোভের প্রেক্ষাপট ও আন্তর্জাতিক সমীকরণ
ইরানে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা এই বিক্ষোভ গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও রাজনৈতিক সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া এই আন্দোলন দমনে খামেনি সরকার কঠোর সামরিক শক্তি প্রয়োগ করছে বলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো দাবি করে আসছে। এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের সরাসরি নেতৃত্ব পরিবর্তনের ডাক মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে (Geopolitics) নতুন উত্তাপ ছড়িয়েছে।
সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা, ট্রাম্পের এই মন্তব্য কেবল কথার কথা নয়, বরং ইরানের ওপর আরও কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা (Sanctions) বা কূটনৈতিক চাপের একটি আগাম সতর্কবার্তা। ওয়াশিংটন এবং তেহরানের এই সরাসরি সংঘাত আগামী দিনে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সমীকরণকে কোন দিকে নিয়ে যায়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।