কুষ্টিয়ার সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় বিদ্যাপীঠ ও উপাসনালয় ‘শ্রী শ্রী গোপিনাথ জিউ মন্দির’। দীর্ঘ ১১ বছর আগে এই মন্দিরের আধুনিকায়নে কয়েক কোটি টাকার একটি মেগা প্রজেক্ট (Mega Project) হাতে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, উন্নয়নের নাম করে সরকারি বরাদ্দের বড় একটি অংশ লোপাট করা হয়েছে। মন্দিরের পুরাতন টেকসই ভবন ভেঙে নতুন দুইতলা ভবন নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও কাজ অসম্পন্ন রেখেই সটকে পড়েছেন ঠিকাদাররা। ফলে একদিকে যেমন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে ব্যাঘাত ঘটছে, অন্যদিকে প্রকল্পের কয়েক কোটি টাকার কোনো হদিস মিলছে না।
নিখোঁজ ফাইল ও দায়সারা উন্নয়ন
মন্দির কমিটি সূত্রে জানা গেছে, ২০১২-১৩ অর্থ বছরে তৎকালীন সরকারের অধীনে এই উন্নয়ন প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। প্রকল্পের আওতায় কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের তত্ত্বাবধানে মন্দিরের পুরাতন অবকাঠামো ভেঙে নতুন করে আধুনিক দুইতলা ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। ৪ থেকে ৫ জন ঠিকাদার (Contractor) পৃথক প্যাকেজে (Package) এই প্রকল্পের কাজ পান। তবে কাজ শুরুর সময় কোনো সাইনবোর্ড বা প্রাক্কলিত ব্যয়ের বিবরণ প্রকাশ করা হয়নি, যা সরকারি ক্রয় বিধির (Public Procurement) স্পষ্ট লঙ্ঘন।
বর্তমানে মন্দিরের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। কংক্রিট ঢালাইয়ের কলাম-বিম দাঁড়ালেও অসমাপ্ত রয়ে গেছে মূল কাঠামো। মন্দিরের প্রবেশপথের বিশাল তিনটি কাঠের দরজা, পানি নিষ্কাশনের ড্রেন এবং দুইতলার ছাদে বড় তিনটি গম্বুজ স্থাপন করার কথা থাকলেও তা করা হয়নি। এছাড়া চারটি ওয়াশ রুমে টাইলস স্থাপন ও ফিনিশিং কাজের আগেই ঠিকাদাররা পুরো কাজ গুটিয়ে নিয়েছেন। এমনকি মন্দির কমিটির কাছে কোনো আনুষ্ঠানিক হ্যান্ডওভার (Handover) ছাড়াই প্রকল্পটি বাতিল বলে ঘোষণা করা হয়েছে।
নিম্নমানের সামগ্রী ও ভবনে ফাটল
প্রকল্পের অর্থ লোপাটের পাশাপাশি নির্মাণ কাজে চরম দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। মন্দির কমিটির সদস্য সুভাষ চন্দ্র রায়ের মতে, পুরো প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল প্রায় ১৩ থেকে ১৪ কোটি টাকা। বিপুল অঙ্কের এই বাজেট সত্ত্বেও নির্মাণ কাজে ব্যবহার করা হয়েছে অত্যন্ত নিম্নমানের সামগ্রী। ভবনটি হস্তান্তরের আগেই দুইতলার দেওয়ালে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে, যা পুরো অবকাঠামোর দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
নথিপত্র ‘উধাও’ হওয়ার রহস্য
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, জেলা পরিষদের নথিপত্র বিভাগ থেকে এই প্রকল্পের মূল ফাইলটি রহস্যজনকভাবে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। জেলা পরিষদের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. রাশিদুর রহমান স্বীকার করেছেন যে, তারা বর্তমানে ফাইলটি হন্যে হয়ে খুঁজছেন। একটি মেগা প্রজেক্টের নথিপত্র কীভাবে সরকারি অফিস থেকে নিখোঁজ হয়, তা নিয়ে স্থানীয় সচেতন মহলে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র প্রতিক্রিয়া। একে দুর্নীতির প্রমাণ লোপাটের একটি অপকৌশল হিসেবে দেখছেন অনেকে।
প্রশাসনের আশ্বাস ও তদন্তের দাবি
চলতি বছরের ৯ নভেম্বর মন্দির কমিটির সভাপতি বিজন কুমার কর্মকার জেলা পরিষদের প্রশাসকের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন। অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, মাঝপথে কাজ বন্ধ করে দেওয়ায় ভক্তরা দীর্ঘ এক দশক ধরে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। তিনি দ্রুত অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করা এবং দুর্নীতির পেছনে জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্তের দাবি জানান।
এ বিষয়ে জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (CEO) মুকুল মৈত্র জানিয়েছেন, এই প্রকল্পটি তার দায়িত্ব গ্রহণের আগের। তবে তিনি মন্দির কমিটির দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি খতিয়ে দেখার এবং অসমাপ্ত কাজগুলো সম্পন্ন করার আশ্বাস দিয়েছেন।
সনাতন ধর্মাবলম্বী ও স্থানীয় বাসিন্দারা এখন দুর্নীতি দমন কমিশনের (ACC) হস্তক্ষেপ কামনা করছেন। তাদের দাবি, একটি পবিত্র ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের নামে যারা সরকারি কোষাগারের অর্থ লুটপাট করেছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে।