সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের মানচিত্রে এক নাটকীয় পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। ওয়াশিংটনের কড়া হুঁশিয়ারি ও কূটনৈতিক চাপকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দেশটির সবচেয়ে বড় তেল ও গ্যাসক্ষেত্রগুলোর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেছে সিরীয় সরকারি বাহিনী। রোববার (১৮ জানুয়ারি) এক রক্তক্ষয়ী অভিযানের পর দেইর এজোর প্রদেশের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘ওমর অয়েল ফিল্ড’ (Omar Oil Field) এবং ‘কনোকো’ (Conoco) গ্যাসক্ষেত্র এখন দামেস্কের দখলে।
কৌশলগত বিজয় ও এসডিএফ-এর বিপর্যয়
নিরাপত্তা সূত্র এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল আরাবিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউফ্রেটিস নদীর পূর্ব তীরে কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ফোর্সেস (SDF)-এর সঙ্গে সিরীয় সেনাবাহিনী এবং তাদের মিত্র আরব গোত্রীয় যোদ্ধাদের তীব্র সংঘর্ষ হয়। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর কুর্দি মিলিশিয়াদের পিছু হটতে বাধ্য করে এই জ্বালানি সমৃদ্ধ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নেয় সরকারি বাহিনী। উল্লেখ্য, এই খনিগুলো ছিল মার্কিন সমর্থিত এসডিএফ-এর আয়ের প্রধান উৎস। ফলে এই দখলদারিত্বের মাধ্যমে কুর্দি বাহিনী কেবল ভূখণ্ডই হারায়নি, বরং তাদের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ডও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে।
ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ ও মার্কিন অবস্থান
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসন পূর্ব সিরিয়ায় তাদের প্রভাব ধরে রাখতে সিরীয় বাহিনীর এই অগ্রযাত্রা বন্ধের আহ্বান জানিয়ে আসছিল। তবে সিরীয় সরকার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ফিরিয়ে আনা তাদের সাংবিধানিক অধিকার। দামেস্কের কর্মকর্তাদের মতে, কুর্দি মিলিশিয়ারা দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে এই সম্পদ আহরণ করে আসছিল। এই অভিযান সফল করার পেছনে স্থানীয় আরব গোত্রীয় যোদ্ধাদের (Arab Tribes) সমর্থন সিরীয় বাহিনীকে বাড়তি সুবিধা দিয়েছে, যা ওই অঞ্চলে মার্কিন কৌশলগত আধিপত্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
মানচিত্রে নতুন রেখা: বাঘুজ থেকে তাবকা
সামরিক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, এই অভিযানের ফলে ইউফ্রেটিস নদীর পূর্ব তীর ধরে প্রায় ১৫০ কিলোমিটারেরও বেশি বিস্তৃত এলাকা এখন আসাদ সরকারের নিয়ন্ত্রণে। ইরাক সীমান্তের বাঘুজ এলাকা থেকে শুরু করে আল-শুহাইল ও বুসাইরা শহর পর্যন্ত এখন সিরীয় পতাকাতলে। কেবল জ্বালানি ক্ষেত্র নয়, অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও বড় জয় পেয়েছে সরকারি বাহিনী। গত শনিবার রাতেই উত্তরাঞ্চলীয় তাবকা শহর এবং সংলগ্ন গুরুত্বপূর্ণ ‘ফ্রিডম ড্যাম’ (Freedom Dam)-এর নিয়ন্ত্রণও সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার নতুন কেন্দ্রবিন্দু
সিরীয় সরকারের এই সামরিক সাফল্য মধ্যপ্রাচ্যের Geopolitics বা ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন উত্তাপ ছড়িয়েছে। ওয়াশিংটন এই অঞ্চল থেকে তাদের উপস্থিতি সরাতে নারাজ হলেও সিরীয় বাহিনী যেভাবে আরব যোদ্ধাদের সংহত করে অগ্রসর হচ্ছে, তাতে মার্কিন কৌশলে ফাটল ধরেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বাঘুজ থেকে তাবকা পর্যন্ত এই বিস্তীর্ণ এলাকার দখল সিরীয় সরকারের জন্য যেমন অর্থনৈতিক স্বস্তি আনবে, তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দামেস্কের রাজনৈতিক দরকষাকষির ক্ষমতাকেও বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।