সাভারের জনবহুল থানা রোডে অবস্থিত পরিত্যক্ত পৌরসভা কমিউনিটি সেন্টারটি গত ছয় মাস ধরে যেন এক জীবন্ত নরকে পরিণত হয়েছিল। একের পর এক রহস্যময় মরদেহ উদ্ধার হলেও এর পেছনের কারিগর ছিল ধরাছোঁয়ার বাইরে। অবশেষে সেই অন্ধকার রহস্যের জট খুলেছে। পুলিশের জালে ধরা পড়েছেন মশিউর রহমান সম্রাট (৪০) নামে এক ভয়ংকর ‘Serial Killer’। সোমবার (১৯ জানুয়ারি) দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ নিশ্চিত করেছে, সম্রাট কোনো সাধারণ অপরাধী বা মানসিক বিকারগ্রস্ত ব্যক্তি নন, বরং অত্যন্ত ‘Cold-blooded’ বা ঠান্ডা মাথার খুনি।
সিসিটিভি ফুটেজে উন্মোচিত ঘাতকের চেহারা
ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম, অপস্ ও ট্রাফিক উত্তর) আরাফাত ইসলাম সংবাদ সম্মেলনে জানান, গত ১৮ জানুয়ারি দিবাগত রাত ৩টার দিকে একটি সিসিটিভি ফুটেজে (CCTV Footage) দেখা যায়, জনশূন্য রাস্তায় এক ব্যক্তি পিঠে করে একটি ভারী বস্তু বহন করছেন, যা দেখতে লাশের মতো। সেই ফুটেজ ও পারিপার্শ্বিক ‘Data Analysis’ করে পুলিশ নিশ্চিত হয় যে, দীর্ঘদিন ধরে ভবঘুরে বেশে ওই এলাকায় বিচরণকারী সম্রাটই এই হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা। রবিবার (১৮ জানুয়ারি) দুপুরে সাভার মডেল থানা পুলিশ তাকে আটক করার পর রাতভর জিজ্ঞাসাবাদের মুখে সে একে একে ছয়টি খুনের রোমহর্ষক বর্ণনা দেয়।
যেভাবে ‘কিলিং জোনে’ পরিণত হলো পরিত্যক্ত ভবন
তদন্তে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় সাভার বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের সামনে অবস্থিত পৌর কমিউনিটি সেন্টারটি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এরপর থেকে ভবনটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে, যা কালক্রমে মাদকসেবী ও অপরাধীদের ‘Safe Haven’ বা অভয়াশ্রমে পরিণত হয়। সম্রাট এই সুযোগটিই কাজে লাগাত। তার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, সে গত ছয় মাসে অন্তত ছয়জনকে হত্যা করে ওই ভবনের বিভিন্ন স্থানে ফেলে রেখেছে।
৬ মাসে ৬ হত্যাকাণ্ড: লাশের মিছিল
পুলিশের রেকর্ড অনুযায়ী, সম্রাট এই পরিত্যক্ত ভবনটিকে তার ব্যক্তিগত ‘Killing Zone’ হিসেবে ব্যবহার করে আসছিল। হত্যাকাণ্ডের সময়রেখা বিশ্লেষণ করলে একটি ভয়ংকর চিত্র ফুটে ওঠে:
২০২৪, ২৯ আগস্ট: হাত-পা বাঁধা অবস্থায় এক অজ্ঞাত যুবকের মরদেহ উদ্ধার।
২০২৪, ১১ অক্টোবর: ভবনের ভেতর থেকে অজ্ঞাত এক নারীর মরদেহ উদ্ধার।
২০২৪, ১৯ ডিসেম্বর: দ্বিতীয় তলার টয়লেটের ভেতর থেকে এক ব্যক্তির গলিত মরদেহ উদ্ধার।
২০২৫, ১৮ জানুয়ারি: সর্বশেষ দুই ব্যক্তির পোড়া মরদেহ উদ্ধার করা হয়, যা এই তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
সাইকো কিলারের ‘Modus Operandi’
প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, সম্রাট অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে তার শিকার নির্বাচন করত। কখনো ছদ্মবেশে আবার কখনো ভবঘুরে সেজে সে মানুষের বিশ্বাস অর্জন করত। এরপর নির্জন পরিত্যক্ত ভবনে নিয়ে গিয়ে তাদের হত্যা করত। তার হত্যাকাণ্ডের ধরন এবং মরদেহ গুম করার চেষ্টা দেখে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে যে, এটি কোনো তাৎক্ষণিক উত্তেজনার ফল নয়, বরং এটি একজন ‘Serial Killer’-এর পরিকল্পিত অপরাধ।
১০ দিনের রিমান্ড ও পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ
এই ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে সম্রাটের ব্যক্তিগত আক্রোশ নাকি এর পেছনে কোনো বড় ‘Crime Syndicate’ জড়িত রয়েছে, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। মামলার অধিকতর তদন্ত এবং হত্যাকাণ্ডের মোটিভ (Motive) বিস্তারিত জানতে সম্রাটকে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করে ঢাকার সিএমএম আদালতে (CMM Court) পাঠানো হয়েছে।
সাভারের এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি জনমনে ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, শুধু পরিত্যক্ত ভবন উদ্ধার নয়, বরং সাভারের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা ও ‘Public Safety’ নিশ্চিত করতে পুলিশি টহল আরও জোরদার করা প্রয়োজন।