• ব্যবসায়
  • বিমা খাতে আস্থাহীনতা প্রকট, কী করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা

বিমা খাতে আস্থাহীনতা প্রকট, কী করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা

ব্যবসায় ১ মিনিট পড়া
বিমা খাতে আস্থাহীনতা প্রকট, কী করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা

এক দশকের বেশি সময় ধরে দেশের বিমা খাত আস্থার সংকট, তারল্য চাপে ন্যুব্জ কোম্পানি এবং দুর্বল নিয়ন্ত্রণের দুষ্ট চক্রে আবদ্ধ।

রাজনৈতিক বিবেচনায় অতিরিক্ত বিমা কোম্পানির অনুমোদন, অকার্যকর নিয়ন্ত্রণ এবং দাবি নিষ্পত্তিতে ব্যর্থতার যে চিত্র ২০২৪ সালে স্পষ্ট হয়েছিল, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন হলো—এ খাতে আদৌ কোনও মৌলিক পরিবর্তন এসেছে কিনা। বাস্তবতা হলো, কিছু নীতিগত উদ্যোগ ও সংস্কারের আলোচনা থাকলেও বিমা খাত এখনও কাঠামোগত দুর্বলতা ও গভীর আস্থাহীনতার খাদেই রয়ে গেছে। পাঁচ পর্বের সিরিজের আজ প্রকাশিত হচ্ছে শেষ পর্ব।

যেসব সমস্যার সঙ্গে লড়তে হচ্ছে বিমা খাতকে

এক দশকের বেশি সময় ধরে দেশের বিমা খাত আস্থার সংকট, তারল্য চাপে ন্যুব্জ কোম্পানি এবং দুর্বল নিয়ন্ত্রণের দুষ্ট চক্রে আবদ্ধ। রাজনৈতিক বিবেচনায় অতিরিক্ত বিমা কোম্পানির অনুমোদন, অকার্যকর নিয়ন্ত্রণ এবং দাবি নিষ্পত্তিতে ব্যর্থতার যে চিত্র ২০২৪ সালে স্পষ্ট হয়েছিল, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন হলো—এ খাতে আদৌ কোনও মৌলিক পরিবর্তন এসেছে কিনা। বাস্তবতা হলো, কিছু নীতিগত উদ্যোগ ও সংস্কারের আলোচনা থাকলেও বিমা খাত এখনও কাঠামোগত দুর্বলতা ও গভীর আস্থাহীনতার খাদেই রয়ে গেছে। পাঁচ পর্বের সিরিজের আজ প্রকাশিত হচ্ছে শেষ পর্ব।

যেসব সমস্যার সঙ্গে লড়তে হচ্ছে বিমা খাতকে

দেশের বিমা খাত দীর্ঘদিন ধরে নানা সমস্যার সঙ্গে সংগ্রাম করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন—সচেতনতার অভাব, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ, মানবসম্পদের সংকট এবং প্রযুক্তিতে পিছিয়ে থাকা—খাতটির টেকসই বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্রাহকরা এখনও বিমা নিয়ে সঠিক ধারণা রাখেন না। অনেকের মধ্যে নেতিবাচক মনোভাব বিরাজ করছে, যা নতুন পলিসি গ্রহণে মানুষকে নিরুৎসাহ তৈরি করছে। সাধারণ মানুষের ধারণা জন্মেছে—বিমা কোম্পানিগুলো শুধু লাভের জন্য কাজ করে এবং গ্রাহকের প্রিমিয়াম যথাযথভাবে ব্যবহার হয় না।

দক্ষ মানবসম্পদের অভাবও এই খাতের বড় চ্যালেঞ্জ। মাঠ পর্যায়ে স্বল্প শিক্ষিত বিক্রয়কর্মীর সংখ্যা বেশি। ফলে গ্রাহকসেবা ও পলিসি বিক্রিতে মানগত ঘাটতি দেখা দেয়।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) তদারকি এবং নীতি প্রয়োগও সীমিত। অনেক কোম্পানিতে সুশাসনের অভাব এবং জবাবদিহি না থাকার কারণে আর্থিক অনিয়ম ও দুর্বলতা দেখা দেয়।

প্রযুক্তিগত দিক থেকেও বিমা খাত পিছিয়ে রয়েছে। ডিজিটাল সেবা না থাকায় পলিসি গ্রহণ ও দাবির প্রক্রিয়ায় গ্রাহকরা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। এছাড়া জীবন বিমায় জালিয়াতির ঘটনা খাতের ওপর আস্থা কমাচ্ছে।

বাজারে প্রতিযোগিতাও তীব্র। অনেক কোম্পানি কম প্রিমিয়ামে পলিসি বিক্রি করে, যা আর্থিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করছে। একইসঙ্গে কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা দুর্বল এবং সাধারণ মানুষের কম আয়ও বিমার প্রসারে বাধা সৃষ্টি করছে। গ্রাহকবান্ধব পণ্যের অভাব এবং দাবির প্রক্রিয়ায় বিলম্ব ও অনিয়মও খাতের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

গত বছরের মার্চ মাসে বিমা খাতের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা যাচাই করার উদ্যোগ নেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। এ লক্ষ্যে সংস্থাটি ৯টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গবেষণা প্রস্তাব আহ্বান করে এবং এক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে।

দেশের বিমা খাতকে স্বচ্ছ, দক্ষ ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে ব্যাপক সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। আইন, প্রশাসন, লাইফ ও নন-লাইফ বিমা এবং প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনা—সব ক্ষেত্রেই একযোগে সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কার্যক্রম ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে, আর বেশ কিছু সংস্কার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

আইডিআরএ সূত্র জানায়, বর্তমানে প্রায় ৭৫টির মতো সংস্কার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। গ্রাহকের স্বার্থ সুরক্ষা, খাতে সুশাসন নিশ্চিতকরণ এবং দীর্ঘদিনের অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা কমিয়ে আনাই এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।

আইডিআরএ’র পরামর্শক (মিডিয়া ও যোগাযোগ) ও মুখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমি বলেন, “গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষায় আইডিআরএ ব্যাপক সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। আইন ও নীতিমালার ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তনের অংশ হিসেবে বিমা আইন ২০১০-এর সংশোধনের খসড়া প্রস্তুত করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠানো হয়েছে।” তিনি জানান, সংশোধিত আইনটি পাস হলে বিমা খাতে অনিয়ম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। তিনি আরও বলেন, ‘‘বিমা খাতে ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে তোলা, জনসাধারণের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং ভালো পারফরম্যান্স করা কোম্পানিগুলোর স্বীকৃতি দিতে ‘আইডিআরএ ইনস্যুরেন্স এক্সিলেন্ট অ্যাওয়ার্ড ২০২৫’ প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই অ্যাওয়ার্ডের আওতায় লাইফ ক্যাটাগরিতে পাঁচটি এবং নন-লাইফ ক্যাটাগরিতে পাঁচটি বিমা কোম্পানিকে সম্মাননা দেওয়া হবে।’’

গ্রাহকদের স্বার্থ সুরক্ষায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে ‘বিমাকারীর রেজুলেশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর খসড়া প্রস্তুত করে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠানো হয়েছে বলে জানান সাইফুন্নাহার সুমি। তার মতে, এই অধ্যাদেশ কার্যকর হলে গ্রাহকদের হতাশা অনেকাংশে কমে আসবে এবং দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা বিমা দাবি অনিষ্পত্তির হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।

যদিও বিমা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গঠনের এক দশকের বেশি সময় পেরোলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থা এখনও সক্ষমতা সংকটে ভুগছে। লোকবল সংকট, দুর্বল তদারকি এবং কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না থাকায় অনিয়মকারীরা বছরের পর বছর পার পেয়ে যাচ্ছে। এর ফলে বাজারে একটি ভয়ংকর বার্তা ছড়িয়েছে— বিমা কোম্পানি দায় এড়াতে পারবে, কিন্তু গ্রাহক পাবে না।

Tags: বিমা খাত আস্থাহীনতা প্রকট নিয়ন্ত্রক সংস্থা