জাতীয় নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, শস্যভাণ্ডার খ্যাত বরিশালে ততই বাড়ছে অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি। রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার, মাদক চোরাচালান এবং ছিনতাইয়ের মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে এসব মারণাস্ত্রের প্রকাশ্য ব্যবহার সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে সড়কপথের পাশাপাশি বরিশালের বিস্তৃত নৌপথ এখন অবৈধ অস্ত্র সরবরাহের ‘সেফ প্যাসেজ’ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কয়েকটি বিচ্ছিন্ন কিন্তু ভয়াবহ ঘটনা এই আশঙ্কার পালে হাওয়া দিচ্ছে। গত ৫ জানুয়ারি নগরের বিসিক (BISIC) এলাকায় জনৈক আকবরের দোকানে মেরামতের জন্য পাঠানো একটি পুরোনো স্টিলের আলমারির ভেতর থেকে সাত রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। আলমারিটি মেরামতের জন্য দিয়েছিলেন জাকির হোসেন নামে এক ব্যক্তি। কোনো বৈধ নথিপত্র না থাকায় পুলিশ জাকিরকে আটক করে। এর আগে ১৭ ডিসেম্বর রাতে মহানগরীর রিফিউজি কলোনী এলাকায় দুই পক্ষের আধিপত্য বিস্তারের জেরে চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে প্রকাশ্যে দুই রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়া হয়। দিনের আলো বা রাতের আঁধার—যেকোনো সময় অস্ত্রের এমন মহড়া জননিরাপত্তাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
অস্ত্র চোরাচালানের ‘ট্রানজিট পয়েন্ট’ এখন নৌপথ
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বরিশালের সড়কপথের তুলনায় নৌপথেই অস্ত্র সরবরাহ বেশি হচ্ছে। বিশেষ করে কীর্তনখোলা নদীর তীরবর্তী অন্তত দশটি পয়েন্ট দিয়ে নিয়মিতভাবে অবৈধ অস্ত্র ও মাদক মহানগরীতে প্রবেশ করছে। রসুলপুর, মোহাম্মদপুর এবং পলাশপুর এলাকা এখন অস্ত্র মজুতের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
মোহাম্মদপুর এলাকার বাসিন্দাদের বক্তব্য অনুযায়ী, গভীর রাতে মাছ কিংবা লবণবোঝাই ট্রলারে (Trawler) করে পিস্টল ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে আসা হয়। এরপর একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেট (Organized Gang) এসব অস্ত্র জেলার বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দেয়। বেলতলা খেয়াঘাট এলাকার বাসিন্দারা জানান, সন্ধ্যা নামলেই নদীর পাড় ধরে সন্দেহজনক ট্রলারের আনাগোনা বেড়ে যায়, যা মূলত মাদক ও অস্ত্র কেনাবেচার বড় মাধ্যম।
উদ্বেগের কেন্দ্রে ৫ আগস্টের ‘লুট হওয়া’ অস্ত্র
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বরিশাল মহানগরীর সম্পাদক রফিকুল ইসলাম এই পরিস্থিতির একটি গভীর সংকটের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। তিনি বলেন, “চব্বিশের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর সারা দেশের বিভিন্ন থানা থেকে যে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র লুট হয়েছে, তার বড় একটি অংশ এখনও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। নির্বাচনের আগে এসব অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি শুধু আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটাবে না, বরং নির্বাচনী পরিবেশকেও প্রভাবিত করতে পারে।” আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর (Law Enforcement Agency) পক্ষ থেকে জোরালো অভিযানের অভাবকেও তিনি এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী করেন।
পুলিশের দাবি ও নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ
তবে মাঠপর্যায়ে আতঙ্ক থাকলেও বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ (BMP) দাবি করছে পরিস্থিতি পুরোপুরি তাদের নিয়ন্ত্রণে। মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম) মো. আব্দুল হান্নান বলেন, “বরিশালের কোনো থানা থেকে অস্ত্র লুটের ঘটনা ঘটেনি। মহানগরীর চারটি থানা এলাকায় যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশ অত্যন্ত তৎপর রয়েছে।” গোয়েন্দা নজরদারি (Intelligence Monitoring) বাড়ানোর পাশাপাশি নিয়মিত টহল জোরদার করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।
নির্বাচনের প্রাক্কালে সাধারণ নাগরিকরা এখন কেবল আশ্বাস নয়, বরং দৃশ্যমান কার্যকর অভিযান প্রত্যাশা করছেন। নদীর প্রবেশপথগুলোতে কড়া নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি না করলে এই মারণাস্ত্রের প্রবাহ থামানো সম্ভব হবে না বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।