আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে চরম উত্তেজনার পারদ চড়িয়ে এবার সরাসরি ইরানকে নজিরবিহীন সামরিক অভিযানের হুঁশিয়ারি দিলেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তেহরান যদি ইসরাইলি ভূখণ্ডে কোনো ধরনের হামলার ‘ভুল’ করে, তবে তার পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর দাবি, ইরানকে এমন এক সামরিক শক্তির মোকাবিলা করতে হবে, যার অভিজ্ঞতা তাদের ইতিহাসে আগে কখনও হয়নি।
নজিরবিহীন হামলার হুঁশিয়ারি ও ‘রেড লাইন’
ইসরাইলের পার্লামেন্ট নেসেটে (Knesset) দেওয়া এক নীতি-নির্ধারণী ভাষণে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সাফ জানিয়ে দেন, তেহরানের প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর নিবিড় নজর রাখছে তেল আবিব। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও আঞ্চলিক প্রক্সি যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নেতানিয়াহুর এই মন্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “যদি তারা ভুল করে এবং আমাদের ওপর আক্রমণ চালায়, তবে আমরা এমন শক্তি ব্যবহার করব যা তারা এর আগে কখনও অনুভব করেনি।” এই বক্তব্যের মাধ্যমে নেতানিয়াহু মূলত ইরানের প্রতি ইসরাইলের ‘Deterrence’ বা প্রতিরোধমূলক কৌশলের কড়া বার্তাই পৌঁছে দিয়েছেন।
অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথে ইরান
ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়েও তীব্র আক্রমণাত্মক মন্তব্য করেন নেতানিয়াহু। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, “ইরানের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা আজ কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারবে না। কারণ, দেশটি আর আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারবে না।” মূলত ইরানে সাম্প্রতিক সরকারবিরোধী বিক্ষোভ এবং তার ওপর প্রশাসনের রক্তক্ষয়ী দমন-পীড়নের ফলে সৃষ্ট অস্থিতিশীলতাকে ইঙ্গিত করেই এই মন্তব্য করেছেন তিনি। এই অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা ইরানের ধর্মতান্ত্রিক সরকারের জন্য বড় ধরণের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মহলে তেহরানকে আরও কোণঠাসা করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে মার্কিন রণতরী ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’
ইসরাইলের এই কঠোর হুঁশিয়ারি এমন এক সময়ে এলো, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক সক্ষমতার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ— পারমাণবিক শক্তিচালিত (Nuclear Powered) বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ (USS Abraham Lincoln)-কে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে মোতায়েন করছে। তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে চলমান কূটনৈতিক ও সামরিক অচলাবস্থার মাঝেই এই ‘Carrier Strike Group’-এর উপস্থিতি পুরো অঞ্চলের সমীকরণ বদলে দিচ্ছে।
জাহাজ-ট্র্যাকিং তথ্যের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন এবং এর সাথে থাকা মার্কিন নৌবহর সিঙ্গাপুর অতিক্রম করে মালাক্কা প্রণালী দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের অভিমুখে অগ্রসর হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক মার্কিন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে, কৌশলগত এই মোতায়েনের মূল উদ্দেশ্য হলো ওই অঞ্চলে ইরানের সম্ভাব্য আগ্রাসন মোকাবিলা করা এবং মিত্রদেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কয়েক দিনের মধ্যেই এই বিশাল রণতরীটি মধ্যপ্রাচ্যের নির্ধারিত সামরিক জোনে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর এই প্রকাশ্য হুমকি এবং মার্কিন ‘Carrier Strike Group’-এর মুভমেন্ট ইরানের ওপর একটি মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির কৌশলী অংশ। পারমাণবিক কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক আধিপত্য নিয়ে ইরান ও পশ্চিমাবিশ্বের যে দ্বন্দ্ব, তা এখন এক বিপজ্জনক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে।