সারাদেশে সরকারের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জাগরণের অংশ হিসেবে ‘মডেল মসজিদ’ প্রকল্প ব্যাপক প্রশংসিত হলেও বরগুনার আমতলীতে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। দীর্ঘ ৮ বছর পেরিয়ে গেলেও আমতলী মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের নির্মাণকাজ শেষ হওয়া তো দূরের কথা, উল্টো প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। বর্তমানে নির্মাণকাজে অত্যন্ত নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ ওঠার পাশাপাশি প্রকল্পের ধীরগতির পেছনে ‘কমিশন’ বাণিজ্যের গুরুতর তথ্য সামনে আসছে।
সরেজমিন অনুসন্ধান ও ‘মানহীন’ সামগ্রীর ব্যবহার
মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) প্রকল্প এলাকা সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, মূল কাঠামোর সলিংয়ের কাজে অত্যন্ত নিম্নমানের এবং ‘তিন নম্বর’ ক্যাটাগরির ইট ব্যবহার করা হচ্ছে। ঢালাইয়ের জন্য স্তূপ করে রাখা হয়েছে কাদা মিশ্রিত বালু ও অনির্ভরযোগ্য পাথর। স্থানীয়দের অভিযোগ, শুরু থেকেই এই প্রকল্পের ‘Quality Control’ বা গুণগত মান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে চরম অবহেলা করা হয়েছে।
বরগুনা গণপূর্ত বিভাগের (PWD) উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. জহিরুল ইসলাম মিরাজ এই অনিয়ম স্বীকার করে নিয়ে জানান, “সলিংয়ের কাজে কিছু নিম্নমানের ইট সরবরাহকারী নিয়ে এসেছিলেন। আমরা সেগুলো দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছি।” তবে স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে রাতে এবং ছুটির দিনে নিয়মিতভাবে এসব নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছে।
দুর্নীতির নেপথ্যে ‘কমিশন’ বাণিজ্য
নির্মাণকাজের সাথে যুক্ত কয়েকজন শ্রমিকের দেওয়া তথ্য চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। তাদের দাবি, ‘Work Order’ বা কাজ পাওয়ার জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে গণপূর্ত বিভাগের অসাধু কর্মকর্তাদের ১০ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত ‘Commission’ বা ঘুষ দিতে হয়। প্রকল্পের বড় একটি অংশ ঘুষের পেছনে ব্যয় হওয়ায় ঠিকাদার নির্মাণসামগ্রীর মানে আপস করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে মসজিদের ‘Structural Integrity’ বা কাঠামোগত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আমতলী পৌরসভার সচেতন নাগরিকরা।
দীর্ঘসূত্রতার কবলে ৮ বছর
২০১৭ সালে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের এই মেগা প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয়। আমতলীতে প্রায় ১২ কোটি ৯০ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে এই কাজ পায় পটুয়াখালীর ‘আবুল কালাম Azad Traders’। চুক্তি অনুযায়ী দুই বছরের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও জমি সংক্রান্ত জটিলতা ও ঠিকাদারের খামখেয়ালিপনায় ২০২১ সাল পর্যন্ত কাজ বন্ধ থাকে। পরবর্তীতে চুক্তি বাতিল করে ২০২৫ সালের জুন মাসে নতুন করে ‘Work Order’ দেওয়া হয় পটুয়াখালীর ফিরোজ মিয়া নামক এক ঠিকাদারকে। তিনি ওই বছরের সেপ্টেম্বর থেকে পুনরায় কাজ শুরু করলেও নির্মাণকাজের ধীরগতি ও নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি প্রকল্পটি।
প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস
আমতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (UNO) মুহাম্মদ জাফর আরিফ চৌধুরী জানান, জেলা প্রশাসকের সমন্বয় সভায় বিষয়টি গুরুত্বের সাথে উত্থাপন করা হয়েছে। তিনি বলেন, “নির্মাণকাজ সার্বক্ষণিক তদারকির জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কোনোভাবেই ধর্মীয় এই স্থাপনার নির্মাণকাজে অনিয়ম বরদাশত করা হবে না।”
অন্যদিকে, গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ফয়সাল আলম জানিয়েছেন, দুর্নীতির অভিযোগটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে ‘Legal Action’ বা আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
বাংলাদেশের অন্যান্য জেলায় আধুনিক স্থাপত্যের মডেল মসজিদগুলো যখন মুসল্লিদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হচ্ছে, তখন আমতলীবাসীর প্রতীক্ষা যেন শেষই হচ্ছে না। স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে প্রকল্পের টাকা নয়ছয় বন্ধ করা হোক এবং আগামী জুনের মধ্যে মসজিদের কাজ সুসম্পন্ন করা হোক।