বিনোদন ডেস্ক: রুপালি পর্দার জাদুকরী সৌন্দর্য আর ধ্রুপদী অভিনয়ের সমার্থক নাম অড্রে হেপবার্ন। ‘রোমান হলিডে’ (Roman Holiday) খ্যাত এই ব্রিটিশ অভিনেত্রী কেবল তাঁর স্টাইল কিংবা ফ্যাশন স্টেটমেন্টের জন্যই নয়, বরং তাঁর অনন্য ব্যক্তিত্ব আর গভীর জীবনবোধের জন্য আজও বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। তবে পর্দার বাইরের অড্রে ছিলেন অনেকটা অন্তর্মুখী এবং প্রচণ্ড মেধাবী। আপনি কি জানেন, হলিউডের এই ‘Fashion Icon’-এর হৃদয়ের খুব কাছের মানুষ ছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর? কবির একটি বিশেষ কবিতা অড্রে তাঁর জীবনের পরম সঙ্গী করে নিয়েছিলেন।
শেষ বিদায়ে গ্রেগরি পেক ও রবীন্দ্রনাথের কবিতা
১৯৯৩ সালের ২০ জানুয়ারি, ৬৩ বছর বয়সে সুইজারল্যান্ডের নিজ বাড়িতে ঘুমের মধ্যে চিরবিদায় নেন অড্রে হেপবার্ন। তাঁর মৃত্যুতে পুরো বিশ্ব যখন শোকাতুর, তখন তাঁর শেষকৃত্যে এক আবেগঘন মুহূর্তের সৃষ্টি করেছিলেন হলিউডের আরেক কিংবদন্তি এবং অড্রের প্রথম সিনেমার সহ-অভিনেতা গ্রেগরি পেক। উইকিমিডিয়া কমন্স ও সমসাময়িক রেকর্ড থেকে জানা যায়, অড্রের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পেক সেদিন তাঁর প্রিয় একটি কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন। সেটি ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘মানসী’ কাব্যগ্রন্থের বিখ্যাত কবিতা ‘অশেষ ভালোবাসা’ বা ‘Unending Love’।
পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালে এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারেও গ্রেগরি পেক সেই স্মৃতিচারণা করেন। তিনি জানান, অড্রে কেবল একজন অভিনেত্রীই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন প্রকৃত কাব্যপ্রেমী। রবীন্দ্রনাথের কবিতার সেই কালজয়ী পঙ্ক্তিগুলো অড্রের জীবনের দর্শনের সঙ্গে মিলে গিয়েছিল।
বহুভাষাবিদ অড্রে ও তাঁর কাব্যপ্রীতি
মে মাসে জন্ম নেওয়া বিশ্বকবির মতো অড্রে হেপবার্নও ছিলেন বসন্তের সন্তান। তিনি কেবল ইংরেজি নয়, বরং ডাচ, ফরাসি, স্প্যানিশ এবং ইতালীয় ভাষায় সমান পারদর্শী ছিলেন। এই ভাষাগত দক্ষতা তাঁকে বিভিন্ন দেশের সাহিত্য পড়ার অবারিত সুযোগ করে দিয়েছিল। তবে রবীন্দ্রনাথে রোমান্টিকতা এবং আধ্যাত্মিকতার যে মিশেল ছিল, তা অড্রেকে গভীরভাবে স্পর্শ করত। বিশেষ করে ‘Unending Love’ কবিতার সেই চিরন্তন প্রেমের আহ্বান তাঁকে এক অনন্য মানসিক প্রশান্তি দিত।
হলিউডের ‘Golden Age’ এবং অড্রের জয়যাত্রা
পঞ্চাশের দশকে ‘রোমান হলিডে’ সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক হয় অড্রের। প্রথম সিনেমাতেই তিনি জিতে নেন সেরা অভিনেত্রীর ‘Academy Award’ বা অস্কার। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। ‘ব্রেকফাস্ট অ্যাট টিফ্যানিস’ (Breakfast at Tiffany’s)-এ তাঁর অভিনয় এবং সাজসজ্জা তাঁকে সর্বকালের সেরা ‘Global Icon’-এ পরিণত করে। তাঁর হাঁটার ভঙ্গি থেকে শুরু করে পোশাকের কাটিং—সবকিছুই হলিউডের সেই ‘Golden Age’-এ এক নতুন সংজ্ঞার জন্ম দিয়েছিল। ‘সাবরিনা’, ‘মাই ফেয়ার লেডি’ কিংবা ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’-এর মতো সিনেমায় তাঁর উপস্থিতি আজও সিনেপ্রেমীদের কাছে পরম আরাধনার বিষয়।
গ্ল্যামার ছেড়ে মানবতার সেবায়
জীবনের শেষ দেড় দশকে অড্রে নিজেকে রুপালি পর্দার চাকচিক্য থেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন। অসীম মমতাময়ী এই নারী তাঁর খ্যাতির আলো ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন অবহেলিত শিশুদের মাঝে। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি ‘UNICEF Ambassador’ হিসেবে কাজ করেছেন। আফ্রিকা থেকে দক্ষিণ আমেরিকা—পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের ক্ষুধার্ত ও আর্ত শিশুদের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, প্রকৃত সৌন্দর্য কেবল অবয়বে নয়, বরং মানুষের কর্মে নিহিত।
আজ অড্রে হেপবার্নের চলে যাওয়ার তিন দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের সেই কবিতার মতোই তাঁর প্রতি মানুষের ভালোবাসা রয়ে গেছে ‘অশেষ’। তিনি বেঁচে আছেন তাঁর কালজয়ী সিনেমা, তাঁর মানবিক কাজ এবং তাঁর সেই অসামান্য ব্যক্তিত্বের মাঝে, যেখানে মিলেমিশে একাকার হয়ে আছেন হলিউড সুন্দরী আর বাংলার বিশ্বকবি।