ঢাকা: গণভবনের আঙিনায় এখন আর নেই সেই ক্ষমতাগর্বী আস্ফালন, বরং সেখানে এখন সংরক্ষিত হয়েছে ১৬ বছরের দুঃশাসন আর ছাত্র-জনতার অদম্য সাহসের মহাকাব্য। মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) বিকেলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস গণভবনে নবনির্মিত ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’-এর চূড়ান্ত পর্যায়ের কাজ পরিদর্শন করেন। চব্বিশের বিপ্লবের রক্তস্নাত ইতিহাস আর ফ্যাসিস্ট শাসনের পতনগাথা প্রত্যক্ষ করে তিনি গভীর আবেগ ও প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
বিপ্লবের স্মৃতিতে সিক্ত গণভবন
বিকেল ৩টার দিকে প্রধান উপদেষ্টা জাদুঘর প্রাঙ্গণে পৌঁছালে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাকে স্বাগত জানান। পরিদর্শনকালে প্রধান উপদেষ্টা ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময়কার সংগৃহীত নিদর্শনাদি খুঁটিয়ে দেখেন। শহীদদের ব্যবহৃত পোশাক, তাদের লেখা শেষ চিঠিপত্র এবং বিপ্লবের উত্তাল দিনগুলোর আলোকচিত্র দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি।
পরিদর্শন শেষে প্রফেসর ইউনূস বলেন, “এই জাদুঘরটি জুলাইয়ের শহীদদের রক্ত তাজা থাকতেই সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে, যা বিশ্ব ইতিহাসে এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত। তবে এই দৃশ্যগুলো যেমন আমাদের গর্বের, তেমনি বেদনার। আমরা চাই না ভবিষ্যতে আর কখনো কোথাও এমন জাদুঘর তৈরির প্রয়োজন পড়ুক। চব্বিশের এই আত্মত্যাগ যেন বাংলাদেশের শেষ রক্তক্ষরণ হয়।”
‘আয়নাঘর’ ও বন্দিদশার ভয়ংকর অভিজ্ঞতা
জাদুঘরটিতে তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের গোপন বন্দিশালা বা ‘আয়নাঘর’-এর আদলে তৈরি কক্ষগুলো পরিদর্শন করেন প্রধান উপদেষ্টা। রাষ্ট্রীয় মদতে গুম ও নির্যাতনের সেই অন্ধকার অধ্যায় দেখে তিনি মন্তব্য করেন, “দেশের প্রতিটি নাগরিকের, বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের দল বেঁধে এখানে আসা উচিত। কেউ যদি চায় আয়নাঘরে কয়েক ঘণ্টা বা একটি দিন কাটানোর অভিজ্ঞতা নিতে, তবে সেই সুযোগ রাখা প্রয়োজন। তবেই মানুষ উপলব্ধি করতে পারবে কী চরম নৃশংসতার মধ্য দিয়ে বন্দিদের দিন অতিবাহিত হয়েছে।” তিনি আরও যোগ করেন, ভবিষ্যতে জাতি যদি কখনো পথ হারায় বা দিশাহারা বোধ করে, তবে এই জাদুঘরই হবে সত্যের দিশারি।
জাতীয় ঐক্যের প্রতিফলন ও অংশগ্রহণ
প্রধান উপদেষ্টার এই পরিদর্শনে উপস্থিত ছিলেন দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ ও ছাত্রনেতারা। উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ, জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। এছাড়াও গুম হওয়া পরিবারের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক সানজিদা তুলি, গুমের শিকার হয়ে ফিরে আসা ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম আরমান এবং অভ্যুত্থানের অন্যতম ছাত্রনেতা আসিফ মাহমুদ ও হাসনাত আব্দুল্লাহ উপস্থিত ছিলেন। এই উপস্থিতি চব্বিশের বিপ্লব পরবর্তী জাতীয় ঐক্যের এক শক্তিশালী চিত্র তুলে ধরে।
রেকর্ড সময়ে অনন্য নির্মাণ
সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা ও প্রখ্যাত নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর নেতৃত্বে একদল দক্ষ কিউরেটর ও গবেষক এই জাদুঘরটির কাজ পরিচালনা করছেন। পরিদর্শনকালে ফারুকী জানান, “এত অল্প সময়ের মধ্যে এমন একটি বৃহৎ প্রকল্প সম্পন্ন করা একটি রেকর্ড। শত শত তরুণ শিক্ষার্থী গত আট মাস ধরে কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই এখানে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেছেন।”
জাদুঘরটিতে ১৬ বছরের দুঃশাসন, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পলায়নের ঐতিহাসিক ভিডিও ফুটেজসহ বিভিন্ন তথ্যচিত্র স্থান পেয়েছে। পরিদর্শনকালে প্রধান উপদেষ্টা চব্বিশের গণহত্যা ও Fascist Regime-এর রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের ওপর নির্মিত ১৫ মিনিটের একটি Documentary উপভোগ করেন।
আগামীর দিশারি চব্বিশের ইতিহাস
সংস্কৃতি উপদেষ্টা আরও উল্লেখ করেন যে, অবশিষ্ট কাজ দ্রুত শেষ করে আগামী নির্বাচনের আগেই জাদুঘরটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। এটি কেবল একটি প্রদর্শনশালা নয়, বরং বাংলাদেশের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের রাজনীতির আকর হয়ে থাকবে। শিল্প-সাহিত্য ও গবেষণার ক্ষেত্রেও এই জাদুঘর এক অনন্য মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।
শহীদদের রক্তে ভেজা এই গণভবন এখন আর কোনো শাসকের আরামগাথা নয়, বরং তা হয়ে উঠেছে শোষণের বিরুদ্ধে গণমানুষের বিজয়ের এক জীবন্ত আর্কাইভ।