এক বছরের মাথায় এসে হোয়াইট হাউসের মেজাজ আরও আক্রমণাত্মক। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত কঠোর ভাষায় ইরানকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, তেহরান যদি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের হুমকি সৃষ্টি করে, তবে দেশটিকে ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করার জন্য তিনি ইতিমধ্যেই চূড়ান্ত সামরিক নির্দেশনা জারি করে রেখেছেন। তাঁর এই মন্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নতুন করে যুদ্ধের মেঘ ঘনীভূত করেছে।
ট্রাম্পের চরম আলটিমেটাম
প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বার্ষিকী উপলক্ষে নিউজ নেশন-এ (NewsNation) সাংবাদিক কেট পাভলিচকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এই মন্তব্য করেন ট্রাম্প। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোনো ধরনের আপস করা হবে না। ট্রাম্পের ভাষায়, "যদি কোনো অঘটন ঘটে, তবে ইরান পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে। এ বিষয়ে আমি অত্যন্ত কঠোর এবং সুনির্দিষ্ট নির্দেশ (Extreme Directive) দিয়ে রেখেছি।"
বাইডেন প্রশাসনের সমালোচনা ও কঠোর অবস্থান
সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প তাঁর পূর্বসূরি জো বাইডেনের কঠোর সমালোচনা করে দাবি করেন, বাইডেনের শাসনামলে ইরানের হুমকির মুখে নমনীয়তা দেখানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, একজন প্রেসিডেন্টকে শুধু পদের মর্যাদা রক্ষা করলেই চলে না, বরং যাঁদের প্রতি হুমকি আসছে, তাঁদের জীবনও নিশ্চিত করতে হবে। ট্রাম্পের হুঙ্কার—হুমকি যদি কোনো সাধারণ ব্যক্তির বিরুদ্ধেও আসে, তবুও তিনি সামরিক শক্তিতে তার দাঁতভাঙা জবাব দেবেন।
পাল্টা হুঁশিয়ারি ইরানের
ট্রাম্পের এই কঠোর বার্তার আগে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান একটি স্পর্শকাতর হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। তেহরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, যদি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে লক্ষ্য করে কোনো হামলা চালানো হয়, তবে তা ‘পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ’ (Full-scale War) হিসেবে গণ্য করা হবে। পেজেশকিয়ানের এই মন্তব্যের পরই ট্রাম্পের পক্ষ থেকে দেশ ধ্বংসের এমন আক্রমণাত্মক হুমকি এল।
মধ্যপ্রাচ্যের দিকে ধেয়ে আসছে মার্কিন রণতরী
ট্রাম্পের এই বাদানুবাদের মধ্যেই সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে সমুদ্রে। বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (AP) জানিয়েছে, মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ (USS Abraham Lincoln) দ্রুত গতিতে উত্তর আরব সাগরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। বর্তমানে রণতরীটি মালাক্কা প্রণালি অতিক্রম করেছে এবং আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
কৌশলগত কারণে বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগর অতিক্রমের সময় রণতরীটি তাদের স্বয়ংক্রিয় পরিচয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা বা এআইএস (AIS) বন্ধ রেখেছিল। মার্কিন নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে একে নিয়মিত ‘Security Protocol’ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও, এই গোপনীয়তা যুদ্ধের উত্তেজনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
ইরানের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও ট্রাম্পের পরামর্শ
গত ডিসেম্বরের শেষ দিক থেকে অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে ইরানে শুরু হওয়া বিক্ষোভ এখন রাজনৈতিক রূপ নিয়েছে। ট্রাম্প ইরানি নেতাদের উদ্দেশে বলেন, ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা না করে বরং সুশাসনে মনোযোগ দেওয়া উচিত। খামেনি এই বিক্ষোভের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করলেও ট্রাম্প একে তেহরানের ব্যর্থতা হিসেবেই দেখছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই আক্রমণাত্মক অবস্থান এবং সরাসরি দেশ ধ্বংসের হুমকি মধ্যপ্রাচ্যে এক বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের ইঙ্গিত দিচ্ছে। রণতরী আব্রাহাম লিংকন গন্তব্যে পৌঁছালে ওয়াশিংটন ও তেহরানের স্নায়ুযুদ্ধ কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।