বর্তমান বিশ্বে মরণব্যাধি বা প্রাণঘাতী রোগের তালিকায় শীর্ষে থাকা অন্যতম নাম ক্যানসার। বিশ্বজুড়ে ক্যানসার আক্রান্তের সংখ্যা যে হারে বাড়ছে, তাতে চিকিৎসকরা এখন প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধের ওপরেই বেশি জোর দিচ্ছেন। আর এই প্রতিরোধের ক্ষেত্রে সবচেয়ে শক্তিশালী ‘অস্ত্র’ হতে পারে আপনার দৈনিক ডায়েট (Diet)।
বিশেষজ্ঞ ও পুষ্টিবিদদের মতে, প্রকৃতিতে এমন কিছু বিশেষ খাবার বা ‘সুপারফুড’ (Superfood) রয়েছে, যা শরীরের কোষগুলোকে ক্যানসারের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে সক্ষম। গবেষণায় দেখা গেছে, নির্দিষ্ট কিছু খাবারের পুষ্টিগুণ ক্যানসারের বীজ অঙ্কুরেই ধ্বংস করার ক্ষমতা রাখে। আসুন জেনে নিই, সুস্থ থাকতে আপনার খাদ্যতালিকায় কোন ৬টি খাবার অবশ্যই রাখা উচিত।
১. মাশরুম: অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের খনি
ক্যানসার প্রতিরোধের লড়াইয়ে মাশরুমের ভূমিকা অনন্য। এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট (Antioxidant), যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে এবং ক্যানসার কোষের বিস্তার রোধে কাজ করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটি (Immunity) বাড়াতে এবং ক্যানসার প্রতিরোধে সপ্তাহে অন্তত দুই থেকে তিন দিন মাশরুম পাতে রাখা জরুরি।
২. কোলিনসমৃদ্ধ ক্রুসিফেরাস সবজি
ক্যানসার প্রতিরোধে কোলিন (Choline) সমৃদ্ধ সবুজ শাকসবজির কোনো বিকল্প নেই। এই তালিকায় রয়েছে ব্রকোলি, বাঁধাকপি, ফুলকপি, শর্ষেশাক ও মুলা। বিজ্ঞানের ভাষায় এদের ‘ক্রুসিফেরাস ভেজিটেবলস’ (Cruciferous Vegetables) বলা হয়। এই সবজিগুলো শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ বা টক্সিন বের করে দিতে সাহায্য করে এবং কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি রোধ করে ক্যানসারের ঝুঁকি কমিয়ে আনে।
৩. এপিজেনিন যৌগসমৃদ্ধ খাবার: প্রাকৃতিক সুরক্ষাকবচ
শরীরে ক্যানসারের বীজ ধ্বংস করতে ‘এপিজেনিন’ (Apigenin) নামক ফ্ল্যাভোনয়েড যৌগ অত্যন্ত কার্যকরী। আপেল, চেরি, আঙুর, ধনেপাতা এবং পার্সলে পাতার মতো খাবারগুলোতে এই যৌগটি প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। চিকিৎসকদের মতে, এই খাবারগুলো নিয়মিত গ্রহণ করলে স্তন ক্যানসার (Breast Cancer), প্রস্টেট ক্যানসার, ফুসফুস, ত্বক ও কোলন ক্যানসারের আশঙ্কা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়।
৪. ভিটামিন সি ও ডিএনএ মেরামত
ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল, বিশেষ করে কিউয়ি (Kiwi) ক্যানসার রোগীদের জন্য মহৌষধের মতো কাজ করে। এটি প্রাকৃতিকভাবে শরীরের ক্ষতিগ্রস্ত ডিএনএ (DNA) মেরামত করতে সক্ষম। বিশেষজ্ঞরা জানান, কেমোথেরাপির (Chemotherapy) পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সামলাতে কিউয়ি ফল দারুণ কার্যকর। এছাড়া কমলালেবু, পাতিলেবু ও আঙুরের মতো সাইট্রাস ফলগুলো শরীরে ভিটামিন সি-এর জোগান দেয়, যা ইমিউন সিস্টেমকে ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়তে প্রস্তুত করে।
৫. গ্রিন টি: কোষের প্রহরী
শরীরের কোষগুলোকে ফ্রি-র্যাডিক্যালের (Free Radicals) হাত থেকে রক্ষা করতে গ্রিন টি-র ভূমিকা সুবিদিত। এতে রয়েছে ‘ইজিসিজি’ (EGCG) নামক একটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা শরীরের প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন (Inflammation) কমাতে সাহায্য করে। প্রতিদিন এক বা দুই কাপ গ্রিন টি পান করলে শরীরের অভ্যন্তরীণ কোষগুলো সুরক্ষিত থাকে এবং ক্যানসারের ঝুঁকি কমে।
৬. রসুন: ক্যানসার কোষের যম
রান্নাঘরে অতি পরিচিত মশলা রসুনের রয়েছে অসামান্য ঔষধি গুণ। রসুনে থাকা ‘অ্যালিসিন’ (Allicin) নামক যৌগটি বিভিন্ন ধরনের ক্যানসার কোষকে সরাসরি ধ্বংস করতে সাহায্য করে। এটি শরীরে ক্যানসারের টিউমার তৈরি হতে বাধা দেয়। তাই রান্নায় রসুনের ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিদিন দুপুরে ভাতের সঙ্গে কাঁচা রসুনের এক কোয়া খাওয়ার অভ্যাস করতে পারেন।
সুস্থ দীর্ঘ জীবনের জন্য শুধুমাত্র চিকিৎসা বিজ্ঞানের ওপর নির্ভর না করে খাদ্যাভ্যাসে এই পরিবর্তনগুলো আনা জরুরি। মনে রাখবেন, একটি সুষম খাদ্যতালিকা (Balanced Diet) এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই হতে পারে ক্যানসারের বিরুদ্ধে আপনার প্রধান প্রতিরক্ষা ব্যুহ।