• দেশজুড়ে
  • কুড়িল মৃধাবাড়িতে ৫ বছরের শিশু আরিফা হত্যা: পুতুল নিয়ে ক্ষোভের মর্মান্তিক জেরে ঘাতক ভাবি গ্রেফতার

কুড়িল মৃধাবাড়িতে ৫ বছরের শিশু আরিফা হত্যা: পুতুল নিয়ে ক্ষোভের মর্মান্তিক জেরে ঘাতক ভাবি গ্রেফতার

দেশজুড়ে ১ মিনিট পড়া
কুড়িল মৃধাবাড়িতে ৫ বছরের শিশু আরিফা হত্যা: পুতুল নিয়ে ক্ষোভের মর্মান্তিক জেরে ঘাতক ভাবি গ্রেফতার

তুচ্ছ ঈর্ষা ও পারিবারিক কলহের বলি এক নিস্পাপ প্রাণ; ভাইয়ের উপহার দেওয়া খেলনা পুতুলই কাল হলো ছোট বোন আরিফার জন্য।

রাজধানীর কুড়িল মৃধাবাড়ি এলাকায় মাত্র পাঁচ বছর বয়সী শিশু আরিফার রহস্যজনক অন্তর্ধানের সমাপ্তি ঘটল বাড়ির নিচের পানির ট্যাংকে। এক নিস্পাপ শিশুকে শ্বাসরোধে হত্যা করে লাশ গুম করার মতো পৈশাচিক অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে তার আপন বড় ভাইয়ের স্ত্রী খাদিজা আক্তারকে (১৬)। বুধবার সন্ধ্যায় এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি জানাজানি হলে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে।

পুতুল নিয়ে ক্ষোভ ও পারিবারিক জিঘাংসা

নিহত আরিফা শরীয়তপুরের ডামুড্ডা উপজেলার সিদুলকুড়া গ্রামের দিনমজুর রাজিব ও হাবেজা বেগম দম্পতির কনিষ্ঠ সন্তান। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে আরিফা ছিল সবার আদরের। সম্প্রতি তাকে স্থানীয় একটি স্কুলে ভর্তিও করা হয়েছিল। তবে এই ছোট্ট শিশুর প্রতি তীব্র বিদ্বেষ পোষণ করতেন তার ১৬ বছর বয়সী ভাবি খাদিজা আক্তার।

পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত ও নিহতের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, আরিফার বড় ভাই হাসান তার ছোট বোনের জন্য প্রায়ই বাইরে থেকে বিভিন্ন উপহার নিয়ে আসতেন। গত মঙ্গলবার রাতেও তিনি আরিফার জন্য একটি প্লাস্টিকের পুতুল ও কিছু ফুল নিয়ে আসেন। ভাইয়ের এই ভালোবাসা মেনে নিতে পারেনি খাদিজা। এই তুচ্ছ ঘটনা কেন্দ্র করে ওই রাতেই স্বামী হাসানের সঙ্গে খাদিজার তীব্র বাকবিতণ্ডা ও ঝগড়া হয়। সেই পুঞ্জীভূত ক্ষোভের চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটে পরদিন সকালে।

পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুমের চেষ্টা

বুধবার (২১ জানুয়ারি) সকালে যখন আরিফার বাবা, মা ও বড় ভাই জীবিকার প্রয়োজনে কর্মস্থলে বেরিয়ে যান, তখন বাড়িতে ছিল কেবল আরিফা ও তার ভাবি খাদিজা। সকাল সাড়ে ৭টার দিকে সুযোগ বুঝে আরিফাকে একা পেয়ে নিজের ঘরে ডেকে নেয় খাদিজা। এরপর অত্যন্ত নৃশংসভাবে শিশুটির গলা চেপে ধরে প্রায় ৩ থেকে ৪ মিনিট শ্বাসরোধ করে রাখে সে। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর মরদেহটি আড়াল করতে কোলে করে নিয়ে বাসার নিচতলার পানির ট্যাংকের ভেতর ফেলে দেয় ঘাতক ভাবি।

CCTV ফুটেজে মিলল কূলকিনারা

ঘটনার ঘণ্টাখানেক পর আরিফার মা কাজ থেকে বাসায় ফিরে সন্তানকে খুঁজে না পেয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েন। সারাদিন খোঁজাখুঁজির পর কোনো সন্ধান না মেলায় তারা বাড়ির সিসিটিভি (CCTV Footage) পরীক্ষা করেন। ফুটেজে দেখা যায়, শিশু আরিফা কোনো সময়ই বাসা থেকে বাইরে বের হয়নি। এতে পরিবারের সদস্যদের সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয় যে আরিফা বাসার ভেতরেই কোথাও রয়েছে। ব্যাপক তল্লাশির এক পর্যায়ে পানির ট্যাংকের ঢাকনা খুলে আরিফার নিথর দেহ ভেসে থাকতে দেখা যায়।

তৎক্ষণাৎ বিষয়টি নিয়ে ভাবি খাদিজাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে অসংলগ্ন কথাবার্তা বলতে থাকে এবং এক পর্যায়ে পরিবারের সদস্যদের কাছে হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে।

আইনি ব্যবস্থা ও পুলিশের বক্তব্য

ভাটারা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মওদুদ কামাল জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে। মরদেহের গলায় শ্বাসরোধের গভীর দাগ এবং ঠোঁটে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। ঘাতক খাদিজাকে ঘটনাস্থল থেকেই পুলিশ হেফাজতে (Police Custody) নেওয়া হয় এবং সে পুলিশের কাছেও অপরাধের বর্ণনা দিয়েছে।

এসআই মওদুদ আরও জানান, আরিফার পরিবার ইতোমধ্যে একটি হত্যা মামলা (Murder Case) দায়ের করেছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গে মরদেহের ময়নাতদন্ত (Post-mortem) সম্পন্ন করার কথা রয়েছে। গ্রেফতার হওয়া খাদিজাকে আজ আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে এই হত্যাকাণ্ডে অন্য কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া না গেলেও বিষয়টি খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

একটি খেলনা পুতুলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ঈর্ষা কীভাবে একটি ফুলের মতো শিশুকে অকালে ঝরিয়ে দিল, তা নিয়ে স্তম্ভিত এলাকাবাসী। পারিবারিক সম্পর্কের এই চরম অবনতি ও অপরাধপ্রবণতা নিয়ে সমাজতাত্ত্বিক মহলেও শুরু হয়েছে নতুন করে উদ্বেগ।