• আন্তর্জাতিক
  • আদালত ও সরকারের দ্বিমুখী চাপে লুৎফুর রহমান

আদালত ও সরকারের দ্বিমুখী চাপে লুৎফুর রহমান

আন্তর্জাতিক ১ মিনিট পড়া
আদালত ও সরকারের দ্বিমুখী চাপে লুৎফুর রহমান

লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটসের বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নির্বাহী মেয়র লুৎফুর রহমানের জন্য চলতি সপ্তাহটি রাজনৈতিকভাবে চরম বিপর্যয়ের বার্তা নিয়ে এসেছে।

একদিকে আদালতের ঐতিহাসিক রায়, অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপ; এই দুইয়ের চাপে বর্তমানে কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছেন এই প্রভাবশালী ব্রিটিশ-বাংলাদেশি রাজনীতিবিদ।

আজ বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি, ২০২৬) আপিল বিভাগ এক ঐতিহাসিক রায়ে জানিয়েছে, বেথনাল গ্রিন, শোর্ডিচ ও কলম্বিয়া রোডের বিতর্কিত ‘লো-ট্রাফিক নেইবারহুড’ (এলটিএন) বা লাইভেবল স্ট্রিট প্রকল্প বাতিলের যে সিদ্ধান্ত মেয়র লুৎফুর রহমান নিয়েছিলেন, তা সম্পূর্ণ বেআইনি ছিল। আদালতের এই ‘কোয়াশিং অর্ডার’ বা বাতিলের আদেশের ফলে রাস্তাগুলো পুনরায় উন্মুক্ত করার যে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি লুৎফুর রহমান দিয়েছিলেন, তা বড় ধরনের আইনি বাধার মুখে পড়ল। ২০২২ সালের নির্বাচনে লুৎফুর রহমানের নেতৃত্বাধীন অ্যাসপায়ার পার্টি’র প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিল রাস্তা খুলে দেওয়া। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের সংগঠন সেভ আওয়ার সেফার স্ট্রিটস-এর করা আপিল মামলায় লর্ড জাস্টিস সিংয়ের সমন্বয়ে গঠিত বিচারক প্যানেল সেই সিদ্ধান্তকে নাকচ করে দিয়েছেন। আদালত জানিয়েছে, টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল ১৯৯৯ সালের গ্রেটার লন্ডন অথরিটি অ্যাক্ট লঙ্ঘন করেছে। লন্ডনের মেয়রের সামগ্রিক পরিবহন পরিকল্পনার বাইরে গিয়ে এককভাবে এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ব্যবস্থা পরিবর্তনের এখতিয়ার টাওয়ার হ্যামলেটস মেয়রের নেই। এর ফলে ওই এলাকার ১৪টি রাস্তা বন্ধই থাকছে, যা চারটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কয়েক হাজার শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আদালতের রায়ের পর এখন পর্যন্ত লুৎফুর রহমানের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

আদালতের এই ধাক্কার পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরকারের তরফ থেকেও বড় চাপের মুখে পড়েছেন লুৎফুর রহমান। ব্রিটিশ সরকারের লোকাল গভর্নমেন্ট সেক্রেটারি স্টিভ রিড টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলে ‘ডিপ ডাইভ’ বা বিশেষ তদন্তের পরিধি আরও বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়া, অনুদান বণ্টন এবং মেয়রের উপদেষ্টা দলের ভূমিকা নিয়ে এখন কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধিরা কঠোর তদন্ত চালাচ্ছেন। কাউন্সিলে প্রশাসনিক স্বচ্ছতার অভাব এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় ঘাটতির অভিযোগ তুলে সরকারের পক্ষ থেকে এই হস্তক্ষেপ করা হয়েছে, যা মেয়রের প্রশাসনিক ক্ষমতায় বড় ধরনের আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মেয়র লুৎফুর রহমানের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে এটি একটি কঠিন সময় হলেও তার সমর্থকরা এখনও তার পাশেই রয়েছেন। সমর্থকদের দাবি, লুৎফুর রহমানের বিরুদ্ধে এবারের মেয়াদে এখন পর্যন্ত কোনও দুর্নীতির প্রমাণ মেলেনি। তারা মনে করেন, বারবার তদন্ত এবং আদালতের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করা মূলত একটি পরিকল্পিত সরকারি কৌশল, যাতে করে জনগণের ভোটে নির্বাচিত একজন জনপ্রিয় ব্রিটিশ-বাংলাদেশি নেতাকে কোণঠাসা করা যায়।

উল্লেখ্য, টাওয়ার হ্যামলেটস শুধু লন্ডনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বারো নয়, বরং এটি ব্রিটেনে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নাগরিকদের প্রধান কেন্দ্র। ২০২১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, এই বারোর জনসংখ্যার প্রায় ৩৪.৬ শতাংশই ব্রিটিশ-বাংলাদেশি, যার সংখ্যা ১ লাখ ৭ হাজারেরও বেশি। ব্রিটেনের মোট বাংলাদেশি জনসংখ্যার প্রতি ছয়জনের একজন এই টাওয়ার হ্যামলেটসেই বসবাস করেন।

এলটিএন প্রকল্প বাতিল করতে না পারা এবং একই সঙ্গে সরকারের কঠোর নজরদারির ফলে লুৎফুর রহমানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন গভীর সংকটে। আগামী ২০২৬ সালের মে মাসে মেয়র নির্বাচনের আগে এই পরিস্থিতি তার জনপ্রিয়তায় কেমন প্রভাব ফেলে, তা-ই এখন দেখার বিষয়।

Tags: সরকার আদালত দ্বিমুখী চাপ লুৎফুর রহমান