• দেশজুড়ে
  • সেন্টমার্টিনের বাসিন্দাদের দুর্দিন, সুদিন ফিরবে কবে

সেন্টমার্টিনের বাসিন্দাদের দুর্দিন, সুদিন ফিরবে কবে

দেশজুড়ে ১ মিনিট পড়া
সেন্টমার্টিনের বাসিন্দাদের দুর্দিন, সুদিন ফিরবে কবে

বঙ্গোপসাগরের বুকে ৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপ সেন্টমার্টিন।

যেখানে শীত মৌসুম এলেই পর্যটকে মুখরিত থাকতো সৈকত। কিন্তু এখন দৃশ্যপট পুরো ভিন্ন। নেই চিরচেনা কোলাহল। আগের মতো ভিড় নেই পর্যটকের। পর্যটন মৌসুমেই ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের দুর্দিন চলছে বলে জানালেন পর্যটন সংশ্লিষ্টরা।

পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, পরিবেশ সংরক্ষণে বিধিনিষেধের কারণে নভেম্বরে পর্যটক না আসায় হোটেল-রেস্তোরাঁ বন্ধ, ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা এবং দ্বীপের কয়েক হাজার মানুষ অভাব-অনটনে দিন কাটাচ্ছেন। যদিও ডিসেম্বরের শুরুতে সীমিত পর্যটক আসায় কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। সরকার দৈনিক দুই হাজার পর্যটকের সীমা ও নির্দিষ্ট সময়ে রাত্রিকালীন থাকার অনুমতি (ডিসেম্বর-জানুয়ারি) দিলেও নভেম্বরে রাত্রিকালীন থাকার নিয়ম না থাকায় পর্যটকদের আগ্রহ কম ছিল। যা স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দুর্দশা বাড়িয়েছে এবং পর্যটন শিল্পের ক্ষতি করেছে। আগামী ৩১ জানুয়ারি পর্যটকদের জন্য শেষ দিন। এরপর ১ ফেব্রুয়ারি থেকে টানা ৯ মাস পর্যটকশূন্য থাকবে দ্বীপ। যদিও চলতি মৌসুমে কাঙ্ক্ষিত আয় হয়নি স্থানীয় ব্যবসায়ীদের। সামনে দীর্ঘ কর্মহীন জীবন আর দুর্দিনের শঙ্কায় রয়েছেন দ্বীপবাসী। সরকারি বিধিনিষেধ

সেন্টমার্টিন দ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় গত ২২ অক্টোবর ১২টি নির্দেশনা–সংবলিত প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল। তাতে বলা হয়, ১ ফেব্রুয়ারি থেকে টানা ৯ মাস বন্ধ থাকার পর ১ নভেম্বর থেকে তিন মাসের জন্য সেন্টমার্টিন উন্মুক্ত থাকবে। দৈনিক দুই হাজার পর্যটক দ্বীপ ভ্রমণে যেতে পারবেন। তবে নভেম্বর মাসে দ্বীপে রাত্রিযাপন করতে পারবেন না। ডিসেম্বর জানুয়ারি দুই মাস রাত্রিযাপনের সুযোগ রাখা হয়। রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা না থাকায় গত নভেম্বর মাসে সেন্টমার্টিন যাননি পর্যটকরা। তবে ডিসেম্বর থেকে ২২ জানুয়ারি পর্যন্ত দিনে এক-দেড় হাজার পর্যটক গেছেন।

পর্যটন ব্যবসাই দ্বীপের মানুষের ভরসা

দ্বীপের মানুষের জীবিকা নির্বাহের প্রধান উৎস ছিল পর্যটন ও মাছ ধরা। বছরের বেশিরভাগ মাস হোটেল, রেস্টুরেন্ট, দোকান, নৌকা চালানো আর গাইডের কাজ করে সংসার চলতো। কিন্তু পর্যটক সীমিত করার ফলে আয়ের খাত বন্ধ হয়ে গেছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, সৈকতের পাশে যেসব বড় হোটেল-মোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে, তার বেশিরভাগই বাইরের লোকজনের মালিকানাধীন। পর্যটক কম আসায় সেগুলোতে কর্মী কমানো হয়েছে। আবার বছরের বেশিরভাগ মাস পর্যটক না আসায় ছোট দোকান, সৈকতের পাশে ভ্রাম্যমাণ দোকান, নৌকার মাঝি কিংবা হকারদেরও তেমন আয় হচ্ছে না। ফলে চলতি মৌসুমে তেমন আয় হয়নি কারও।

দুশ্চিন্তা ও হতাশায় ব্যবসায়ীরা

দ্বীপের জেটিঘাটের কাছাকাছি এলাকায় ২০ বছর ধরে শুঁটকির ব্যবসা করেন মনজুর আলম। তিনি সেন্টমার্টিন পশ্চিম পাড়ার বাসিন্দা। সাত জনের পরিবার তার। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘স্বজনদের কাছে থেকে চার লাখ টাকা ধার নিয়ে মৌসুমের শুরুতে ব্যবসা শুরু করি। কিন্তু এখনও দোকানের অধিকাংশ মাছ অবিক্রিত রয়ে গেছে। দোকান ভাড়া এবং পাঁচ জন কর্মচারীর বেতনও বাকি। আর মাত্র কয়েক দিন আছে। এরপর সেন্টমার্টিনে পর্যটক আসতে পারবে না। এর মধ্যে এতগুলো শুঁটকি বিক্রি করতে না পারলে কীভাবে ধার পরিশোধ করবো, সেই চিন্তায় ঘুম আসে না।’ তিনি বলেন, ‘দ্বীপের বেশিরভাগ মানুষ জেলে। পর্যটন ব্যবসা ছাড়া তেমন কোনও পেশা নেই। আমি সাগরে মাছ ধরতে গেলে অসুস্থ হয়ে পড়ি। তাই এই ব্যবসাই আমার শেষ ভরসা। এটিও যদি না চলে সংসার চলবে কীভাবে আমার।’

টমটম চালকদের আয়ের পথ বন্ধ

দুই লাখ ২০ হাজার টাকায় একটি টমটম কিনে সেন্টমার্টিন দ্বীপে চালানো শুরু করেন মোহাম্মদ জমির উদ্দিন। ২২ বছর এই পেশায় পার করে দেওয়া জমির এখন ধারদেনায় ডুবে আছেন। জমির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দ্বীপে তেমন রাস্তাঘাট নেই। আমরা পর্যটকদের নিয়ে সৈকতে ঘোরাফেরা করেই ভালো আয় করতাম। কিন্তু এখন সরকারি বিধিনিষেধ থাকায় সৈকতে গাড়ি চালালে জরিমানা ও জব্দ করা হয়। কয়েকদিন ধরে অভিযান চলছে। তাই এখন কোনও ভাড়া পাচ্ছি না।’

তিনি আরও বলেন, ‘পরিবারে ছয় সদস্য রয়েছে। ভাড়া না পেলে সংসার চালানো কঠিন। তার ওপর ধারে কেনা টমটমের টাকা শোধ করতে পারিনি। পর্যটক বন্ধের সময় আমাদের যাতায়াতের ক্ষেত্রেও বাধা, মনে হয় দেশের ভেতর আরেক দেশে বাস করছি।’

কটেজ বানিয়ে লোকসান

দ্বীপের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব পাড়া বিচের পাশে ‘আমিন বাড়ি’ হোমস্টে মালিক মোহাম্মদ আমিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তিন লাখ টাকা খরচ করে কটেজ সংস্কার করেছি। কিন্তু মাত্র চার দিন বুকিং পেয়েছি। খরচের টাকাটা উঠলে মনকে বোঝানো যেতো। খুব কষ্টে দিন যাচ্ছে। শুধু আমি নই, সবার একই অবস্থা।’

একই কথা বলেছেন ডেইল পাড়ার কটেজ মালিক আব্দুল আজিজ। তিনি বলেন, ‘প্রতি বছর ৭-৮ লাখ টাকা আয় হতো। এবার পুরো মৌসুমে আয় হয়েছে ১১ হাজার টাকা। স্টাফের বেতন দিতে হয়েছে ধার করে। সিন্ডিকেটের কারণে ব্যবসা একেবারে মন্দা। ঢাকা-কক্সবাজারভিত্তিক সিন্ডিকেট জাহাজ ও হোটেল বুকিং একচেটিয়া করে স্থানীয়দের ব্যবসা ধ্বংস করে দিয়েছে। লোকসানে আছি আমরা।’

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মাঝে হাহাকার

দ্বীপে নারিকেল ও ডাব বিক্রেতা, দোকানি, ভ্রাম্যমাণ দোকানি, ভ্যান-টমটম চালকসহ সবার মুখে হাহাকারের কথা উঠে এলো। তারা বলছেন, পর্যটক কম। আয় কম, এজন্য ধার বাড়ছে। এভাবে চললে তাদের না খেয়ে মরতে হবে।

দ্বীপের বাসিন্দা নুর আলম বলেন, ‘দ্বীপ বাঁচাতে গিয়ে যদি মানুষকে বাঁচানো না যায়, তাহলে দ্বীপ রক্ষা কার জন্য? তাহলে সেন্টমার্টিনে সুদিন ফিরবে কবে।’

লোকসানে হোটেল ব্যবসায়ীরা

সেন্টমার্টিন দ্বীপের দোকান মালিক সমিতির সহসভাপতি মৌলভী নুর আহমদ জানান, বছরের নয় মাস পর্যটক না থাকায় দ্বীপের কয়েক হাজার মানুষ অভাব-অনটনে দিন কাটান। ২৩০টির বেশি হোটেল, রেস্তোরাঁ, দোকানপাট বন্ধ থাকে। এতে ব্যবসায়ীদের মাসের পর মাস লোকসান গুনতে হয়। সবাইকে কষ্ট করতে হচ্ছে। একই কথা বলেছেন সেন্টমার্টিন হোটেল মালিক সমিতির সভাপতি মাহবুব উল্লাহ। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দ্বীপের মানুষের ১২ মাসই যুদ্ধের মধ্য দিয়ে চলতে হয়। বিশেষ করে অভাবের কারণে খাদ্য সংকট এবং চিকিৎসা নিয়ে বেশি কষ্টে থাকে দ্বীপবাসী। তাই পর্যটকদের জন্য দ্বীপ অন্তত চার মাস খোলা রাখা দরকার।পরিবেশ রক্ষার নামে দ্বীপে পর্যটক বন্ধ রেখে আসলে পরিবেশ কতটুকু উন্নত হয়েছে।’

দ্বীপের বাসিন্দা অধিকারকর্মী তৈয়ব উল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অন্যান্য বছরের তুলনায় এই মৌসুমে ব্যবসায়ীদের তেমন আয় হয়নি। কারণ পর্যটক তেমন আসেনি। আবার কক্সবাজার-ঢাকার বিনিয়োগকারীরা সিন্ডিকেট করে জাহাজ-হোটেলগুলোতে এককভাবে ব্যবসা করেছেন। যেসব পর্যটক এসেছেন, তারা উন্নতমানের হোটেলে ছিলেন, যার কারণে কিছুটা অনুন্নত হোটেল পর্যটক পায়নি। পর্যটক আসা বন্ধ থাকলে দ্বীপের মানুষের মাঝে দুর্দিন নেমে আসে। তাই দ্বীপের মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া সরকারের উচিত।’

দ্বীপের মানুষের এই দুর্দিন কাটবে কবে

দ্বীপের মানুষের এই দুর্দিন কাটবে কবে এমন প্রশ্ন তুলেছেন সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সেন্টমার্টিন যদি বাংলাদেশের অংশ হয়ে থাকে তাহলে কেন স্থানীয় বাসিন্দাদের এত নিয়মকানুন মেনে যাতায়াত করতে হবে। বিদেশ যেতে যেমন পাসপোর্ট লাগে ঠিক তেমনিভাবে পর্যটক বন্ধের সময় যাতায়াত করতে হয়।’

তিনি বলেন, ‘এবার পর্যটন শিল্পে স্থানীয়দের কোনও আয়রোজগার হয়নি। শুধু দুই-একটা হোটেল ছাড়া। আমার নিজেরও খাবার হোটেলসহ একটা কটেজ রয়েছে, সেটি ৪০ হাজার টাকা খরচ করে সংস্কার করেছি। কিন্তু দুঃখের বিষয় এক টাকারও ব্যবসা হয়নি। শুধু আমি না, স্থানীয়দের ছোট-বড় দেড়শ কটেজ রয়েছে। যার কোনোটি ভাড়া হয়নি এই মৌসুমে। এবার একটু চিন্তা করে দেখেন পর্যটন শিল্পের সঙ্গে জড়িত দ্বীপের ৯ হাজার মানুষের অবস্থা কতটা বেহাল। সামনে বন্ধের দিনে এসব মানুষের না খেয়ে উপাস থাকতে হবে। আমরা সরকারের নিয়মনীতি মানতে রাজি। কিন্তু বিনিময়ে কি খাবার জুটবে? এভাবে চললে তো এখানে দুর্ভিক্ষ নামবে।

সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, রাতে সৈকতে আলো জ্বালানো, শব্দ সৃষ্টি, বারবিকিউ পার্টি, কেয়াবনে প্রবেশ, কেয়া ফল সংগ্রহ বা ক্রয়-বিক্রয় এবং সামুদ্রিক কাছিম, পাখি, প্রবাল, রাজ কাঁকড়া, শামুক-ঝিনুকসহ যেকোনো জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। সৈকতে মোটরসাইকেল, সি-বাইকসহ যেকোনো মোটরচালিত যান চলাচল নিষিদ্ধ থাকবে। তা ছাড়া ভ্রমণকালে পলিথিন বহন করা যাবে না। একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক যেমন চিপসের প্যাকেট, প্লাস্টিক চামচ, স্ট্র, সাবান ও শ্যাম্পুর মিনি প্যাক, ৫০০ বা ১০০০ মিলিলিটারের প্লাস্টিক বোতল রাখতেও নিষেধ করা হয়েছে। পর্যটকদের নিজেদের পানির ফ্লাক্স সঙ্গে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইমামুল হাফিজ নাদিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সেন্টমার্টিন দ্বীপের পরিবেশ রক্ষা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য পর্যটক নিয়ন্ত্রণ একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। তবে আমরা দ্বীপবাসীর কষ্ট বুঝি। জীবিকা ও কর্মসংস্থানের বিষয়টি মাথায় রেখে সরকারিভাবে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা চলছে। পর্যায়ক্রমে সহায়তার পরিকল্পনাও আছে।

Tags: সেন্টমার্টিন বাসিন্দা দুর্দিন সুদিন