প্রকৃতির সান্নিধ্যে ঘাস বা বালির ওপর খালি পায়ে হাঁটার অনেক স্বাস্থ্যগত উপকারিতা রয়েছে—এটি রক্ত সঞ্চালন বাড়ায় এবং পেশিকে সচল রাখে। কিন্তু সেই একই অভ্যাস যখন আমরা ঘরের শক্ত টাইলস বা মোজাইক করা মেঝেতে প্রয়োগ করি, তখন তা উপকারের বদলে মারাত্মক শারীরিক ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সাম্প্রতিক গবেষণায় চিকিৎসকরা সতর্ক করেছেন যে, দীর্ঘ সময় ঘরের ভেতর খালি পায়ে হাঁটা পায়ের স্থায়ী ক্ষতিসহ শরীরের কাঠামোগত ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।
ব্যাহত হয় পায়ের ‘বায়োমেকানিক্যাল ফাংশন’
আমাদের পা শরীরের পুরো ওজন বহন করে। যখন আমরা টাইলস বা কাঠের মতো শক্ত সমতল পৃষ্ঠে খালি পায়ে হাঁটি, তখন পায়ের ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়ে। এর ফলে পায়ের স্বাভাবিক ‘বায়োমেকানিক্যাল ফাংশন’ (Biomechanical Function) বাধাগ্রস্ত হয়। বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, শক্ত মেঝেতে দীর্ঘক্ষণ হাঁটলে পায়ের পাতার ভারসাম্য নষ্ট হয়, যা সরাসরি প্রভাব ফেলে হাঁটু, নিতম্ব এবং মেরুদণ্ডের নিচের অংশে। এর ফলে দীর্ঘস্থায়ী ব্যাক পেইন বা পিঠে ব্যথার সমস্যা তৈরি হতে পারে।
পঞ্চাশোর্ধ্ব নারীদের জন্য বিশেষ সতর্কতা
বয়স পঞ্চাশ পেরোলে নারীদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে যায়। চিকিৎসকদের মতে, এই বয়সে হরমোনজনিত পরিবর্তনের কারণে পায়ের তলার চর্বিযুক্ত স্তর বা ‘ফ্যাট প্যাড’ (Fat Pad) পাতলা হয়ে যায়। এই অবস্থায় খালি পায়ে শক্ত মেঝেতে হাঁটলে পায়ের হাড়ের ওপর সরাসরি চাপ পড়ে, যা থেকে গোড়ালির তীব্র ব্যথা এবং জয়েন্টের সমস্যা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তাই মধ্যবয়সী নারীদের ঘরের ভেতরেও নরম ও আরামদায়ক চটি ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়।
পায়ের স্থায়ী বিকৃতি ও টেন্ডোনাইটিসের ঝুঁকি
শক্ত পৃষ্ঠে ক্রমাগত খালি পায়ে হাঁটার ফলে পায়ের পাতার অন্তর্নিহিত গঠনে পরিবর্তন আসতে পারে। এতে ‘অ্যাকিলিস টেন্ডোনাইটিস’ (Achilles Tendinitis) বা ‘শিন স্প্লিন্ট’-এর মতো বেদনাদায়ক পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। দীর্ঘমেয়াদে এই ভারসাম্যহীনতা পায়ের হাড়ের অবস্থানে পরিবর্তন ঘটিয়ে স্থায়ী বিকৃতিও ডেকে আনতে পারে।
সংক্রমণ ও চর্মরোগের আশঙ্কা
ঘরের মেঝে বাইরে থেকে আসা জুতো বা ধুলোবালির কারণে বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের (Fungus) আবাসস্থল হতে পারে। খালি পায়ে হাঁটার ফলে খুব সহজেই ‘অ্যাথলেট’স ফুট’ (Athlete’s Foot) বা নখের কোণে ছত্রাক সংক্রমণ হতে পারে। বিশেষ করে জিম বা কমন বাথরুম ব্যবহারের সময় খালি পায়ে থাকা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এই জীবাণুগুলো ত্বকের ফাটল দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে জ্বালাপোড়া ও সংক্রমণের সৃষ্টি করে।
ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ‘লাল সতর্কতা’
ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য খালি পায়ে হাঁটা জীবনঘাতী হতে পারে। রক্তে শর্করার আধিক্যের কারণে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে এবং স্নায়বিক দুর্বলতার (Neuropathy) কারণে পায়ে চোট লাগলে তারা অনেক সময় বুঝতে পারেন না। ছত্রাকের সংক্রমণ বা ত্বকের ফাটল থেকে তৈরি ছোট ক্ষতও তাদের ক্ষেত্রে পচন বা ‘গ্যাংগ্রিন’ তৈরি করতে পারে। চরম পর্যায়ে এই সংক্রমণ থেকে অঙ্গচ্ছেদ বা ‘Amputation’-এর মতো ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে পারেন রোগী।
কখন খালি পায়ে হাঁটা নিরাপদ?
খালি পায়ে হাঁটা সব সময় ক্ষতিকর নয়। ঘাস, বালি বা কার্পেটের মতো নরম ও প্রাকৃতিক পৃষ্ঠে হাঁটলে পায়ের পেশি ও লিগামেন্টের নমনীয়তা বাড়ে। এটি ‘Blood Circulation’ উন্নত করতে এবং শরীরের ক্লান্তি দূর করতে সাহায্য করে। তবে আধুনিক নগরায়নের এই যুগে আমাদের ঘরের মেঝে যেহেতু বেশিরভাগই শক্ত ও অমসৃণ নয়, তাই ঘরের ভেতরেও একজোড়া নরম জুতো পরা আপনার দীর্ঘমেয়াদী সুস্থতার জন্য অপরিহার্য।