চট্টগ্রামের পলোগ্রাউন্ড ময়দানে বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমানের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত জনসভাকে কেন্দ্র করে বন্দরনগরীতে গড়ে তোলা হয়েছিল এক অভেদ্য ‘নিরাপত্তা বেষ্টনী’ (Security Blanket)। ড্রোন টহল, গোয়েন্দা নজরদারি এবং কয়েক স্তরের পুলিশি পাহারার মধ্যেও খোদ জনসভাস্থলের প্রবেশদ্বার থেকে ১৮টি মাইক এবং ৫ কয়েল তার চুরির এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। প্রশাসনের এত কড়াকড়ি ও ‘VVIP Protocol’-এর মাঝে এমন চুরির ঘটনায় আয়োজক এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম বিস্ময় ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
‘নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা’ ও জনসভার প্রস্তুতি
দীর্ঘ ২০ বছর পর চট্টগ্রামের কোনো রাজনৈতিক সমাবেশে সশরীরে অংশ নিতে শনিবার রাতে চট্টগ্রামে পৌঁছান তারেক রহমান। এই সফর ঘিরে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (CMP) বিশেষ সতর্কতা জারি করেছিল। সমাবেশের আগে পলোগ্রাউন্ড ময়দান ও আশপাশের এলাকায় সব ধরনের অস্ত্র, দাহ্য পদার্থ, এমনকি লাঠি বা পাথর বহনও নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। শনিবার রাত থেকেই নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে যান চলাচল সীমিত করে বিপুল সংখ্যক পুলিশ, র্যাব ও সাদা পোশাকের গোয়েন্দা সদস্য মোতায়েন করা হয়। নিরাপত্তার খাতিরে আকাশে ড্রোন উড়িয়ে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হচ্ছিল।
যেভাবে হলো রহস্যজনক চুরি
জনসভার শব্দবিন্যাস বা ‘Sound System’-এর দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠান ‘রাজ সাউন্ড’-এর মালিক আবদুর রাজ্জাক জানান, বিশাল এই আয়োজনের জন্য তারা প্রায় ২০০টি মাইক বিভিন্ন পয়েন্টে স্থাপন করেছিলেন। শনিবার রাত ১১টা পর্যন্ত সবকিছু ঠিকঠাক ছিল। এমনকি তাদের নিজস্ব পাহারাদারও এলাকায় নিয়োজিত ছিল। কিন্তু রোববার (২৫ জানুয়ারি) সকালে চূড়ান্ত পরীক্ষার সময় দেখা যায়, জনসভাস্থলের মূল গেটের বাইরের সড়কের ইলেকট্রিক পোল থেকে প্রায় ১৫-১৬ ফুট উচ্চতায় লাগানো ১৮টি মাইক ইউনিট এবং ৫ কয়েল তার গায়েব হয়ে গেছে।
আবদুর রাজ্জাক বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, “রাস্তায় পুলিশের এত কঠোর টহল এবং ড্রোন নজরদারির মধ্যে এত উঁচুতে উঠে কারা এই চুরি করল, তা আমাদের মাথায় আসছে না। বিএনপি নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করে আমি কোতোয়ালী থানায় একটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেছি।”
পুলিশের ভাষ্য ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আফতাব উদ্দিন কিছুটা দায়সারা মন্তব্য করেন। তিনি সংবাদমাধ্যমকে জানান, সকাল থেকেই তিনি ‘VVIP Protocol’ এবং জনসভার সার্বিক নিরাপত্তা ডিউটিতে অত্যন্ত ব্যস্ত ছিলেন, তাই চুরির বিষয়টি সম্পর্কে তিনি এখনও বিস্তারিত অবগত নন।
একজন হেভিওয়েট রাজনৈতিক নেতার সফর এবং ‘High-profile’ একটি জনসভাকে কেন্দ্র করে যখন পুরো শহর নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা, তখন জনসভাস্থলের একদম নাকচ ডগা থেকে বিপুল পরিমাণ ‘Logistics’ বা সরঞ্জাম চুরি হওয়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। অনেকে একে নিছক চুরি হিসেবে না দেখে রাজনৈতিক উসকানি বা নাশকতার চেষ্টা হিসেবেও দেখছেন।
২০ বছর পর রাজপথে তারেক রহমান
উল্লেখ্য, আইনি জটিলতা ও দীর্ঘ নির্বাসন শেষে রাজনৈতিক দৃশ্যপটে তারেক রহমানের এই প্রত্যাবর্তন বিএনপির তৃণমূল নেতা-কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে। রোববার দুপুরে তিনি সমাবেশস্থলে উপস্থিত হয়ে লক্ষ লক্ষ নেতা-কর্মীর সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। তবে ঐতিহাসিক এই সমাবেশের আগের রাতে এমন ‘দুর্ধর্ষ’ চুরির ঘটনাটি জনসভার আলোচনাকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে।