ভেনেজুয়েলা থেকে কিউবাভিমুখী তেল সরবরাহ বন্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্রের নেওয়া পদক্ষেপকে ‘আন্তর্জাতিক জলদস্যুতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে কিউবা। রোববার (২৫ জানুয়ারি) কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে কিউবার রাষ্ট্রদূত কার্লোস দে সেসপেডেস ওয়াশিংটনের এই মারমুখী অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি দাবি করেন, ভেনেজুয়েলার তেলবাহী জাহাজ জব্দ করে এবং নৌ অবরোধ (Naval Blockade) আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক আইন ও শিষ্টাচারের চরম লঙ্ঘন করছে।
নৌ অবরোধ ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
গত কয়েক দিনে মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার ভূ-রাজনীতি (Geopolitics) নাটকীয় মোড় নিয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার পর থেকেই কিউবার ওপর চাপের মাত্রা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। ওয়াশিংটন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ভেনেজুয়েলার কোনো তেল এখন থেকে কিউবার বন্দরে পৌঁছাতে দেওয়া হবে না।
এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে মার্কিন নৌবাহিনী সমুদ্রপথে কঠোর নজরদারি চালাচ্ছে এবং কিউবা অভিমুখে যাওয়া তেলবাহী জাহাজগুলো জব্দ করছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই পদক্ষেপ কিউবার ভঙ্গুর অর্থনীতিকে সম্পূর্ণ ধসিয়ে দেওয়ার একটি সুপরিকল্পিত কৌশল।
৬৭ বছরের ইতিহাসে ভয়াবহতম চাপ
রাষ্ট্রদূত কার্লোস দে সেসপেডেস তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “বিপ্লবের ৬৭ বছরের ইতিহাসে কিউবা এর আগে কখনও এত শক্তিশালী ও বৈরী মার্কিন চাপের মোকাবিলা করেনি। এটি স্রেফ কোনো নিষেধাজ্ঞা নয়, এটি একটি স্বাধীন দেশের বিরুদ্ধে সরাসরি অর্থনৈতিক যুদ্ধ।” তিনি আরও যোগ করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমায় জাহাজ জব্দ করে মূলত আধুনিক যুগের ‘জলদস্যু’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
জ্বালানি সংকট ও বিকল্পের সন্ধান
ভেনেজুয়েলার সঙ্গে কিউবার দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ বাণিজ্য ও নিরাপত্তা (Trade and Security) সম্পর্ক রয়েছে। কিউবার বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতের সিংহভাগ তেল আসে ভেনেজুয়েলা থেকে। বর্তমান সরবরাহ সংকটের ফলে দেশটিতে ভয়াবহ জ্বালানি সংকট (Energy Crisis) দেখা দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তবে কিউবা হাল ছাড়তে নারাজ। রাষ্ট্রদূত জানান, কিউবা বর্তমানে মেক্সিকোসহ অন্যান্য মিত্র দেশগুলো থেকে তেল আমদানির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মেক্সিকো থেকে তেলের কার্গো আসা শুরু হলেও তা ভেনেজুয়েলার অভাব পূরণ করতে পারবে কি না, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে সংশয় রয়েছে।
বিপ্লবী আদর্শে অনড় তেহরান
সাক্ষাৎকারে কার্লোস দে সেসপেডেস ফিদেল কাস্ত্রোর বিপ্লবী আদর্শের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, “আমরা এক বিন্দু তেল না পেলেও নিজেদের মনোবল হারাবো না। কিউবাকে ভয় দেখানো সম্ভব নয়। আমাদের দেশপ্রেম এবং শান্তির অধিকার রক্ষা করতে আমরা শেষ পর্যন্ত প্রস্তুত।”
তিনি বিশ্বের শান্তিকামী দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই একতরফা আধিপত্যবাদ রুখে দেওয়া এখন সময়ের দাবি। ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ সংকটে কিউবাকে বলির পাঁঠা বানানো হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের এই ‘ম্যাক্সিমাম প্রেশার’ বা সর্বোচ্চ চাপের নীতি কিউবা ও ভেনেজুয়েলার সরকার পরিবর্তন করতে পারবে কি না, তা অনিশ্চিত। তবে এই সংঘাতের ফলে ল্যাটিন আমেরিকায় রাশিয়ার প্রভাব বৃদ্ধি এবং নতুন কোনো শরণার্থী সংকটের (Refugee Crisis) সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।