সোমবার (২৬ জানুয়ারি) সেনাসদরে সশস্ত্র বাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘‘জনগণের আস্থার প্রতীক হিসেবে সশস্ত্র বাহিনী অতীতের মতো এবারও পেশাদারত্ব, নিরপেক্ষতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করবে— এ বিষয়ে সরকার আশাবাদী।’’
প্রধান উপদেষ্টা মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই–আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান এবং দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় সশস্ত্র বাহিনীর অবদান কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন।
তিনি বলেন, ‘‘ফ্যাসিবাদ পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা জাতির ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।’’
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘‘গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। দীর্ঘদিনের ভোটাধিকার বঞ্চিত একটি জাতি ২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নিজের দেশের দায়িত্ব গ্রহণের জন্য যে আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছে, এই নির্বাচনে ভোটদান হবে তার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ।’’
তিনি বলেন, “গণভোটের মাধ্যমে মানুষ যেমন ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থা নির্মাণে তার মতামত ব্যক্ত করবে, তেমনই সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে তারা সেই মতামত বাস্তবায়নের জন্য যোগ্য জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করবেন। তাই এই নির্বাচনের গুরুত্ব অতীতের যেকোনও সময়ের চেয়ে অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ।”
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘‘এই নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে আমাদের মনে রাখতে হবে— তরুণদের একটি বিরাট অংশ এবারই প্রথম ভোট দিতে যাচ্ছে। এছাড়া বড়দের মধ্যেও অনেকে দীর্ঘদিন ভোটাধিকার বঞ্চিত ছিলেন। এরকম একটি পরিস্থিতিতে সব ভোটারদের জন্য একটি শঙ্কামুক্ত ও উৎসবমুখর ভোটের পরিবেশ নিশ্চিত করতে আমাদের সবার দায়িত্ব রয়েছে। দেশের সামগ্রিক বাস্তবতায় আমি মনে করি, এই দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনের জন্য সশস্ত্র বাহিনী একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। সক্ষম, পেশাদার, নিরপেক্ষ ও জনমুখী বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী এই গুরুদায়িত্ব সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন করে জাতিকে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর নির্বাচন উপহার দিতে সর্বোচ্চ সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে আমি আশাবাদী।’’
তিনি বলেন, ‘‘একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি। দেশের প্রতিটি নাগরিক যেন ভয়মুক্ত পরিবেশে, কোনও প্রভাব ব্যতীত নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে, তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনকে সর্বোচ্চভাবে সহায়তা প্রদান করতে হবে।’’
নির্বাচন প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বকে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়ে বলেন, ‘‘মাঠপর্যায়ে সব সিদ্ধান্ত হতে হবে আইনসম্মত, সংযত ও দায়িত্বশীল।’’ সামান্য বিচ্যুতিও যেন জনগণের আস্থাকে ক্ষুণ্ন না করে— সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, ‘‘তরুণ ও দীর্ঘদিন ভোটাধিকার বঞ্চিত নাগরিকদের অংশগ্রহণে এবারের নির্বাচন বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। তাই ভয়মুক্ত পরিবেশে প্রত্যেক নাগরিকের ভোটাধিকার প্রয়োগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব।’’
প্রধান উপদেষ্টা একটি শান্তিপূর্ণ, স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের পথে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
ড. ইউনূস বলেন, “দীর্ঘ ফ্যাসিস্ট শাসনকালে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতার বিষয়টি উপেক্ষিত থেকে গেছে। আমরা অত্যন্ত অল্প সময়ে এই পরিস্থিতির ব্যাপক পরিবর্তন সূচনা করেছি। দায়িত্বভার গ্রহনের পর থেকে বর্তমান সরকার সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতার উন্নয়ন এবং যেকোনও আগ্রাসন মোকাবিলার জন্য যুগোপযোগী করে গড়ে তোলা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একটি প্রধান অগ্রাধিকার।”
প্রফেসর ইউনূস বলেন, ‘‘সশস্ত্র বাহিনীর স্বনির্ভরতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বর্তমানে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সামরিক অস্ত্র ও সরঞ্জামাদি তৈরীর কারখানা স্থাপনের কার্যক্রম চলমান আছে।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ইতোমধ্যে নেদারল্যান্ডস ও মালয়েশিয়ার সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা স্মারক সই হয়েছে এবং ইতালি, জাপান, থাইল্যান্ডসহ আরো কয়েকটি দেশের সাথে অনুরূপ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা স্মারক সইয়ের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এসব সমঝোতা স্মারক সম্পাদিত হলে সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা ও আভিযানিক দক্ষতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে।’’
স্বশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে এসব উদ্যোগ ভবিষ্যতের নির্বাচিত সরকারও এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন প্রধান উপদেষ্টা।
সেনাসদরের হেলমেট অডিটোরিয়ামে সশস্ত্র বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মতবিনিময় সভার অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছালে প্রধান উপদেষ্টাকে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম নাজমুল হাসান, বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন এবং সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লে. জেনারেল এস এম কামরুল হাসান স্বাগত জানান।
মতবিনিময় সভায় সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তারা এবং সংশ্লিষ্ট আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।