• মতামত
  • রাষ্ট্র, ক্ষমতা ও নীরবতার সময় ডাভোসে ট্রাম্প: বৈশ্বিক অস্থিরতা ও মানবিকতার সংকট

রাষ্ট্র, ক্ষমতা ও নীরবতার সময় ডাভোসে ট্রাম্প: বৈশ্বিক অস্থিরতা ও মানবিকতার সংকট

ডাভোসের মঞ্চে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিতর্কিত মন্তব্য বৈশ্বিক ক্ষমতার নগ্ন চেহারাকে প্রকাশ করেছে। এই সময়ে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অকার্যকারিতা ও রাষ্ট্রের জনগণের প্রতিনিধিত্বের বদলে বৈশ্বিক পুঁজির মধ্যস্থতাকারীতে পরিণত হওয়ার প্রবণতা নিয়েই এই মতামত।

মতামত ১ মিনিট পড়া
রাষ্ট্র, ক্ষমতা ও নীরবতার সময় ডাভোসে ট্রাম্প: বৈশ্বিক অস্থিরতা ও মানবিকতার সংকট

আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে রাষ্ট্র আছে, কিন্তু রাষ্ট্রচিন্তা নেই। সরকার আছে, কিন্তু জনগণের উপস্থিতি ক্ষীণ। নির্বাচন আছে, কিন্তু সিদ্ধান্ত আগেই নির্ধারিত। এই বৈপরীত্য শুধু কোনো একক দেশের সমস্যা নয়, এটি আজকের বৈশ্বিক বাস্তবতা। যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক বিভাজন ও জলবায়ু বিপর্যয়ের এই অস্থিরতাকে মানুষ নীরবে মেনে নিচ্ছে, আর এই নীরবতার ভেতরেই নতুন ক্ষমতার কাঠামো গড়ে উঠছে।

বিশ্বের দিকে তাকালে চারদিকে অস্থিরতা। যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক বিভাজন, উদ্বাস্তু সমস্যা, জলবায়ু বিপর্যয়—এরকম বহু সংকট। কিন্তু এর চেয়েও গভীর একটি পরিবর্তন নীরবে ঘটছে। মানুষ ধীরে ধীরে এই অস্থিরতাকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিচ্ছে। অন্যায় আর বিস্ময় জাগায় না। নীরবতা হয়ে উঠছে প্রতিক্রিয়ার ভাষা।

ডাভোসে বৈশ্বিক নীতির নির্মাণ ডাভোসে কোনো আইন পাস হয় না বা কোনো রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয় না। তবু এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানেই বৈশ্বিক নীতির ভাষা নির্মিত হয়। রাষ্ট্রপ্রধান, করপোরেট নেতৃত্ব, সামরিক শিল্প এবং প্রযুক্তি পুঁজির প্রতিনিধিরা একত্র হয়ে ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তের দিকনির্দেশ স্থির করেন। পরে সেই সিদ্ধান্ত গণতন্ত্রের আনুষ্ঠানিক কাঠামোর ভেতর দিয়ে বাস্তবায়িত হয়। আজকের ডাভোস এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করেছে, যেখানে কূটনৈতিক ভদ্রতার বদলে আমরা দেখি শক্তির সরাসরি উচ্চারণ।

ট্রাম্প ও আন্তর্জাতিক কাঠামোর নগ্ন বাস্তবতা ডোনাল্ড ট্রাম্প এই দীর্ঘদিনের পরিবর্তনের একটি প্রকাশ্য রূপ মাত্র। গাজা, জাতিসংঘ, ন্যাটো বা গ্রিনল্যান্ড নিয়ে তার বক্তব্য যতটা না নতুন, তার চেয়ে বেশি নগ্ন। আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার কিংবা বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলো আজ শক্তিধর রাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থের অধীন। ট্রাম্প যা বলেন প্রকাশ্যে, অন্যরা তা করে নীরবে। জাতিসংঘ নৈতিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করতে পারছে না, কারণ ভেটো ক্ষমতা ও শক্তির রাজনীতি তাকে অকার্যকর করে তুলেছে। এখানে ন্যায় মুখ্য নয়, ভারসাম্যই মুখ্য।

ক্ষমতার রাজনীতিতে ভূরাজনীতি গ্রিনল্যান্ডের প্রশ্ন এই ক্ষমতার রাজনীতিকে আরও স্পষ্ট করে। এখানে মানবিকতা মুখ্য নয়, ভূরাজনীতি মুখ্য। আর্কটিক অঞ্চল, প্রাকৃতিক সম্পদ, সামরিক অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ বাণিজ্য পথকে কেন্দ্র করে নতুন মানচিত্র আঁকা হচ্ছে, যেখানে মানুষের মতামত গৌণ হয়ে পড়ছে। ন্যাটোর ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা; কাগজে-কলমে সম্মতির জোট হলেও বাস্তবে এটি একটি শক্তিনির্ভর কাঠামো। নিরাপত্তা বলতে আজ আর মানুষের জীবনমান বোঝানো হয় না, নিরাপত্তা মানে অস্ত্র, বাজেট এবং ভয় টিকিয়ে রাখা।

বদলে যাওয়া রাষ্ট্রের চরিত্র ও বৈধতার সংকট এই সবকিছুর ভেতর দিয়ে রাষ্ট্রের চরিত্র বদলে যাচ্ছে। রাষ্ট্র আর জনগণের প্রতিনিধি নয়, রাষ্ট্র হয়ে উঠছে বৈশ্বিক পুঁজি ও সামরিক শক্তির মধ্যস্থতাকারী। নাগরিক তখন আর রাজনৈতিক সত্তা নয়, সে নীতির দর্শক। আধুনিক রাষ্ট্র জনগণের সম্মতি থেকে বৈধতা দাবি করলেও, যখন ভোটে সরকার বদলায় কিন্তু নীতির দিক বদলায় না, তখন সেই বৈধতা প্রশ্নের মুখে পড়ে। রাষ্ট্র দ্বৈত চরিত্র ধারণ করে—একদিকে গণতন্ত্র, অন্যদিকে জনগণের বাইরে গড়ে ওঠা সিদ্ধান্ত। এই দ্বৈততা রাষ্ট্র ও মানুষের সম্পর্ককে দুর্বল করে।

বাংলাদেশে বৈশ্বিক বাস্তবতার প্রতিফলন এই বৈশ্বিক বাস্তবতার প্রতিফলন বাংলাদেশেও স্পষ্ট। বাংলাদেশে রাষ্ট্রচিন্তা সংকুচিত, নীতিনির্ধারণে জনগণের উপস্থিতি দুর্বল। উন্নয়ন সংজ্ঞায়িত করে একটি সীমিত গোষ্ঠী এবং নিরাপত্তা ব্যাখ্যা করা হয় নিয়ন্ত্রণের ভাষায়, জীবনের ভাষায় নয়। বৈশ্বিক অর্থনীতি, ঋণ, বিনিয়োগ এবং কৌশলগত সম্পর্কের চাপে রাষ্ট্র নাগরিকের প্রশ্নকে গৌণ করে ফেলে। সবচেয়ে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে নীরবতা। মানুষ রাজনীতি থেকে দূরে সরে যায়, যা রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তোলে।

নতুন রাষ্ট্রচিন্তার অপরিহার্যতা এই বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে নতুন রাষ্ট্রচিন্তা জরুরি। এই রাষ্ট্রচিন্তা বলবে, রাষ্ট্রের কেন্দ্রে মানুষ থাকবে, পুঁজি নয়; নিরাপত্তা মানে অস্ত্র নয়, জীবন; গণতন্ত্র মানে শুধু ভোট নয়, অংশগ্রহণ; এবং রাষ্ট্র জবাবদিহি করবে জনগণের কাছে, বৈশ্বিক ক্ষমতার কাছে নয়। এটি কোনো হঠাৎ বিপ্লবের ডাক নয়, এটি ধীর কিন্তু মৌলিক পরিবর্তনের আহ্বান। রাষ্ট্র তখনই বদলায়, যখন মানুষ রাষ্ট্রকে নিজের বলে দাবি করে। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি সরল—রাষ্ট্র কি মানুষের জন্য, না মানুষ রাষ্ট্রের জন্য।

Tags: donald trump bangladesh nato un global politics democracy crisis davos state power silence