মানুষের শরীরের অন্যতম শক্ত অংশ হলো দাঁতের এনামেল (Enamel)। এটি কেবল দাঁতকে সাদা দেখাতেই সাহায্য করে না, বরং দাঁতের ভেতরের সংবেদনশীল অংশগুলোকে বাইরের আঘাত ও ব্যাকটেরিয়া থেকে সুরক্ষা দেয়। তবে আধুনিক জীবনযাত্রায় আমাদের খাদ্যাভ্যাসের কারণে এই অমূল্য সুরক্ষাকবচ প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে পড়ছে। দন্তবিশেষজ্ঞদের মতে, এনামেল একবার নষ্ট হয়ে গেলে তা আর আগের অবস্থায় ফেরানো যায় না, যার ফলে দাঁতে শিরশিরানি (Sensitivity) ও ক্যাভিটির মতো সমস্যা দেখা দেয়।
আপনার অজান্তেই দাঁতের এনামেল নষ্ট করে দিচ্ছে এমন ৭টি খাবার ও পানীয় সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. অতিরিক্ত টক জাতীয় ফল ও জুস লেবু, কমলা, মাল্টা, আনারস কিংবা তেঁতুলের মতো সাইট্রাস জাতীয় ফলে প্রচুর পরিমাণে সাইট্রিক অ্যাসিড (Citric Acid) থাকে। এই অ্যাসিড সরাসরি দাঁতের এনামেলের ওপর আক্রমণ করে এবং ধীরে ধীরে একে পাতলা করে ফেলে। নিয়মিত টক ফল খাওয়ার পর মুখ ভালো করে জল দিয়ে না ধুলে এনামেল ক্ষয়ের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
২. সফট ড্রিংকস ও এনার্জি ড্রিংকস কোলা, সোডা কিংবা বিভিন্ন এনার্জি ড্রিংককে দাঁতের প্রধান শত্রু বলা যেতে পারে। এই পানীয়গুলোতে উচ্চমাত্রায় চিনি এবং ফসফরিক ও সাইট্রিক অ্যাসিডের সংমিশ্রণ থাকে। এই মিশ্রণটি দাঁতের পিএইচ লেভেল (pH Level) কমিয়ে দেয়, যা এনামেলকে দ্রুত গলিয়ে ফেলে বা ‘অ্যাসিড ইরোজন’ (Acid Erosion) ঘটায়।
৩. আঠালো মিষ্টি ও চিনিযুক্ত ক্যান্ডি চকলেট, টফি, ক্যারামেল কিংবা জেলি ক্যান্ডি দাঁতের খাঁজে দীর্ঘক্ষণ আটকে থাকে। মুখের ভেতরে থাকা ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া (Bacteria) এই চিনি থেকে অ্যাসিড তৈরি করে, যা দাঁতের উপরিভাগে গর্ত বা ডেন্টাল ক্যারিস সৃষ্টি করে। আঠালো হওয়ার কারণে এগুলো ব্রাশ করার পরও সহজে পরিষ্কার হতে চায় না।
৪. প্যাকেটজাত ফ্রুট জুস বাজারের প্যাকেটজাত ফলের রসে সরাসরি ফলের পুষ্টিগুণের চেয়ে প্রিজারভেটিভ, কৃত্রিম চিনি ও অ্যাসিডের পরিমাণ অনেক বেশি থাকে। প্রাকৃতিক রসের তুলনায় এই পানীয়গুলো দাঁতের এনামেলের জন্য অনেক বেশি ক্ষতিকারক।
৫. ভিনেগারযুক্ত খাবার ও আচার আচার কিংবা সালাদ ড্রেসিংয়ে ব্যবহৃত ভিনেগারে থাকে অ্যাসিটিক অ্যাসিড। এই উপাদানের নিয়মিত সংস্পর্শে দাঁতের উপরিভাগের খনিজ উপাদান (Minerals) ক্ষয় হতে শুরু করে। বিশেষ করে যারা নিয়মিত ভিনেগার মিশ্রিত ফাস্টফুড খান, তাঁদের দাঁত দ্রুত ক্ষয় হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়।
৬. অতিরিক্ত চা ও কফি চা ও কফিতে থাকে ‘ট্যানিন’ (Tannins) নামক উপাদান, যা দাঁতে কালচে বা হলদেটে দাগ সৃষ্টি করে। এছাড়া অতিরিক্ত কফি খাওয়ার ফলে দাঁতের এনামেল দুর্বল হয়ে পড়ে এবং দাঁতের উজ্জ্বলতা নষ্ট হয়ে যায়। চিনি ছাড়া চা বা কফি তুলনামূলক কম ক্ষতিকর হলেও এর আধিক্য বর্জন করা শ্রেয়।
৭. অ্যালকোহল ও ধূমপান অ্যালকোহল সেবনের ফলে লালা গ্রন্থি থেকে লালা বা স্যালাইভা (Saliva) উৎপাদন কমে যায়, যা মুখকে শুষ্ক করে ফেলে। লালা প্রাকৃতিকভাবে দাঁতকে পরিষ্কার রাখে এবং অ্যাসিড প্রশমিত করে। মুখ শুষ্ক হয়ে পড়লে দাঁতের প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং এনামেল দ্রুত নষ্ট হয়।
দাঁত সুরক্ষিত রাখার বিশেষ পরামর্শ ১. অ্যাসিডিক বা মিষ্টি জাতীয় খাবার খাওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে ব্রাশ করবেন না। কারণ ওই সময় এনামেল নরম থাকে। অন্তত ৩০ মিনিট অপেক্ষা করে তারপর ব্রাশ করুন। ২. যেকোনো খাবার খাওয়ার পরপরই পরিষ্কার জল দিয়ে ভালো করে মুখ কুলকুচি (Rinse) করে নিন। ৩. দাঁতের সুরক্ষায় এবং এনামেল মজবুত করতে ফ্লুরাইডযুক্ত (Fluoride) টুথপেস্ট ব্যবহার করুন। ৪. স্ট্র ব্যবহার করে পানীয় পান করার চেষ্টা করুন, এতে দাঁতের সংস্পর্শে অ্যাসিড কম পৌঁছাবে।
মনে রাখবেন, সুন্দর হাসি ধরে রাখতে নিয়মিত দন্ত্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং সঠিক খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখা অপরিহার্য।