তবে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে কোন্দলের কারণে আসনগুলোতে ভাগ বসাতে চায় জামায়াত। একাধিক আসনে বিদ্রোহী ও স্বতন্ত্র প্রার্থী থাকায় জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির ভোটের লড়াইটা জমে উঠবে বলে জানিয়েছেন ভোটাররা।
রাজশাহীর গোদাগাড়ী বেসরকারি মাধ্যমিক সহকারী শিক্ষক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক ও রাজশাহী-১ আসনের সরমংলা এলাকার ভোটার মশিউর রহমান জানান, ‘এবারের নির্বাচনে আমাদের এখানে বিএনপি-জামায়াত সমানতালে অবস্থান করছে। আমার ধারণা এবার এই আসনে লড়াইটা হবে ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার মধ্যে। শেষ পর্যন্ত কে জিতে বলা মুশকিল।
একই কথা বলছেন রাজশাহী-২ আসনের নগরীর ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটার লাইলা নাসরিন। তিনি বলেছেন, ‘বিএনপি-জামায়াতের প্রার্থীদের লড়াইয়ের আভাস পাচ্ছি।’
শুধু শিক্ষক মশিউর কিংবা গৃহিণী লাইলা নাসরিন নন, রাজশাহীর ছয়টি আসনের বেশিরভাগ ভোটারের ভাষ্যমতে, মনোনয়ন নিয়ে বিএনপির কোন্দলের কারণে এবারের নির্বাচনে রাজশাহী জেলায় জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বিএনপির ভোটের লড়াইটা জমে উঠবে।
বিএনপি ছয় আসনে প্রার্থী ঘোষণার পর থেকে দলীয় কোন্দল প্রকাশ্যে আসা শুরু করেছিল। রাজশাহী-২ (সদর) ও রাজশাহী-৬ (বাঘা-চারঘাট) বাদে বাকি চারটি আসনে প্রার্থী বদলের দাবি উঠেছিল। রাজশাহী-১ আসনে বিক্ষোভ মিছিল, রাজশাহী-৩ আসনে বিক্ষোভ মিছিল ও সড়ক অবরোধ, রাজশাহী-৪ আসনে সম্ভাব্য প্রার্থীর সমর্থকদের বিরুদ্ধে মনোনয়নপ্রত্যাশী প্রার্থীর লোকজনের বাড়িঘরে হামলার অভিযোগ এবং প্রার্থী বদলের দাবিতে সমাবেশ, রাজশাহী-৫ আসনে সংবাদ সম্মেলন ও বিক্ষোভ করেছেন মনোনয়নপ্রত্যাশী অন্য প্রার্থীর সমর্থকরা।
প্রার্থী পরিবর্তনের দাবিতে আন্দোলনের কারণে বিএনপি বেশ অস্বস্তিতে ছিল। যদিও তা শেষ পর্যন্ত মিটমাট করা গেছে। সেটি ভোটের মাঠে কতটুকু প্রভাব ফেলবে তা দেখার বিষয়। তবে গত ফেব্রুয়ারিতে প্রার্থী ঘোষণা করে প্রস্তুতিতে এগিয়ে আছে জামায়াতে ইসলামী।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে রাজশাহী মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, ‘বিএনপির দীর্ঘদিনের শক্তিশালী রাজনৈতিক অবস্থান থাকার কারণে অন্য দল সুযোগ পাবে না। তবে মনোনয়ন নিয়ে কিছুটা অসন্তোষ ছিল। সেটা কেটে গেছে। এখন আমরা সবাই নির্বাচনি মাঠে একসঙ্গে দলের প্রার্থীর জন্য কাজ করছি। এতে করে রাজশাহী জেলার সব আসনেই আমাদের ভালো ফলাফল আসবে।
তবে মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি ইমাজ উদ্দিন মন্ডল বলেন, ‘আগে বিএনপির শক্ত অবস্থান ছিল। এখন নেই। বিএনপি নেতাকর্মীদের নেতিবাচক অবস্থানই জামায়াতকে নির্বাচনের মাঠে বাড়তি সুবিধা দেবে। ভোটাররাও তাদের এসব বিরোধ নিয়ে বিরক্ত।
রাজশাহীর ছয়টি সংসদীয় আসনে ৩০ জন প্রার্থী। এর মধ্যে ২৬ জনই দলীয় প্রার্থী। আর স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন চার জন। দলীয় প্রার্থীদের নিজ নিজ দলের প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আর স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সংরক্ষিত অন্য প্রতীক পেয়েছেন। তার মধ্যে রাজশাহী-১ আসনে চার জন, রাজশাহী-২ আসনে ছয় জন, রাজশাহী-৩ আসনে পাঁচ জন, রাজশাহী-৪ আসনে চার জন, রাজশাহী-৫ আসনে সাত জন ও রাজশাহী-৬ আসনে চার জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
ছয়টি আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন ৩৮ জন। প্রত্যাহারের শেষ দিনে তিন জন প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন। এখন বৈধ প্রার্থী ৩০ জন। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিনে জেলার এক ও দুই আসনের তিন জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেন। তারা হলেন- রাজশাহী-১ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপি নেতা সুলতানুল ইসলাম তারেক, রাজশাহী-২ আসনের লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) মো. ওয়াহেদুজ্জামান ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ফজলুল করিম।
রাজশাহী-১ আসনে নির্বাচনি মাঠে রয়েছেন বিভিন্ন দলের চার জন। এর মধ্যে রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনে বিএনপির শরীফ উদ্দিন, জামায়াতের অধ্যাপক মজিবুর রহমান, গণঅধিকার পরিষদের মো. শাহজাহান (ট্রাক), আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) আবদুর রহমান (ঈগল)। এই আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৬৮ হাজার ৩৫৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৩৪ হাজার ৭৯, নারী ২ লাখ ৩৪ হাজার ২৭৭ ও হিজড়া তিন জন।
রাজশাহী-২ (সদর) আসনে লড়ছেন ছয় জন। এর মধ্যে বিএনপির মিজানুর রহমান মিনু, জামায়াতের ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, আমার বাংলাদেশ পার্টির মু.সাঈদ নোমান, নাগরিক ঐক্যের মোহাম্মদ সামছুল আলম, বাংলাদেশ লেবার পার্টির মেজবাউল ইসলাম ও স্বতন্ত্র সালেহ আহমেদ। এই আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৬৯ হাজার ৫৬৪ জন। তাদের মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৭৮ হাজার ২৫১, নারী ১ লাখ ৯১ হাজার ৩০৫ ও হিজড়া আট জন। স্বতন্ত্র প্রার্থী সালেহ আহমেদ নিয়েছেন মোটরসাইকেল প্রতীক।
রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনে লড়ছেন পাঁচ জন। এর মধ্যে বিএনপির শফিকুল হক মিলন, জামায়াতের আবুল কালাম আজাদ, জাতীয় পার্টির আফজাল হোসেন, ইসলামী আন্দোলনের ফজলুর রহমান ও আমজনতার দলের সাইদ পারভেজ। এই আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ২৩ হাজার ১৯৯ জন। পুরুষ ২ লাখ ১০ হাজার ৮৮৬, নারী ২ লাখ ১২ হাজার ৩০৭ ও হিজড়া ভোটার ছয় জন।
রাজশাহী-৪ (বাগমারা) আসনে লড়ছেন চার জন। তারা হলেন- বিএনপির ডি.এম.ডি জিয়াউর রহমান, জামায়াতের আবদুল বারী সরদার, জাতীয় পার্টির ফজলুল হক ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের তাজুল ইসলাম খান। আসনটিতে মোট ভোটার ৩ লাখ ১৯ হাজার ৯২৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৬০ হাজার ৭৩৫, নারী ১ লাখ ৫৯ হাজার ১৮৬ ও হিজড়া চার জন।
রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দুর্গাপুর) আসনে লড়ছেন সাত জন। তারা হলেন বিএনপির নজরুল ইসলাম, জামায়াতের মনজুর রহমান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের রুহুল আমিন, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির আলতাফ হোসেন মোল্লা, স্বতন্ত্র ইসফা খায়রুল হক, স্বতন্ত্র রায়হান কাওসার ও স্বতন্ত্র রেজাউল করিম। এই আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৫৩ হাজার ১৭৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৭৬ হাজার ৬৬৮, নারী ১ লাখ ৭৬ হাজার ৫০০ ও হিজড়া পাঁচ জন।
আসনটিতে বিএনপির দুই জন বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। এর মধ্যে পুঠিয়া উপজেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি ইসফা খায়রুল হক স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঘোড়া প্রতীক বরাদ্দ পেয়েছেন। একই আসনে যুক্তরাজ্য জিয়া পরিষদের সহসভাপতি রেজাউল করিম পেয়েছেন ফুটবল প্রতীক। আসনটিতে রায়হান কাওসার নামে আরেকজন স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন। গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নবঞ্চিত রায়হান কাওসার এবার পেয়েছেন মোটরসাইকেল প্রতীক।
রাজশাহী-৬ (চারঘাট-বাঘা) আসনে লড়ছেন চার জন। তারা হলেন বিএনপির আবু সাইদ চাঁদ, জামায়াতের নাজমুল হক, জাতীয় পার্টির ইকবাল হোসেন ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আবদুস সালাম সুরুজ। এই আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৯৫৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৭৮ হাজার ১৮, নারী ১ লাখ ৭৮ হাজার ৯৩৩ ও হিজড়া দুজন।
আগের নির্বাচনগুলোর ফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০০১ সালে রাজশাহীর সবগুলো আসন ছিল বিএনপির দখলে। এরপরে তারা আর কোনও আসন পায়নি। ২০০৮ সালের নির্বাচনে রাজশাহীর ছয়টি আসনের মধ্যে পাঁচটিতে আওয়ামী লীগ ও একটিতে বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টি জয়ী হয়। ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচন বয়কট করেছিল বিএনপি ও জামায়াত। ২০১৮ সালের নির্বাচনে রাজশাহীর আসনগুলো আওয়ামী লীগের দখলে ছিল।
১৯৯১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত রাজশাহীর ছয়টি আসনেই বিএনপির দাপুটে অবস্থান ছিল। অতীতের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনগুলোতেও তুলনামূলক ভালো ফল করেছে বিএনপি। তবে ২০০৮ সালের পর থেকে তাদের কোনও আসন ছিল না। ২০১৪ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশই নেয়নি। ১৮ নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ছিল কারচুপির অভিযোগ।
আসনগুলোতে গত নভেম্বরে বিএনপি প্রার্থিতা চূড়ান্ত করলেও জামায়াতে ইসলামী আরও কয়েক মাস আগেই প্রার্থীদের মাঠে নামিয়েছে। আগে থেকেই নির্বাচনকেন্দ্রিক বেশ কিছু কমিটিও গঠন করেছে দলটি। ফলে ভোটের মাঠে প্রচারণায় আগে থেকে এগিয়ে জামায়াত।
অতীত নির্বাচনের ফলাফলে দেখা গেছে, ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে রাজশাহী-১ আসন থেকে জামায়াতের বর্তমান নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বিজয়ী হলেও পরবর্তীতে আর কোনও নির্বাচনে অন্য আসনগুলো থেকে জয় পাননি দলটির প্রার্থীরা। যে কারণে এবার রাজশাহীর আসনগুলোতে জয় পেতে মরিয়া দল। পাশাপাশি দুর্গ উদ্ধার করতে চায় বিএনপি।