মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা নতুন করে তুঙ্গে তুলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে চরম হুঁশিয়ারি প্রদান করেছে ইরান। শনিবার (৩১ জানুয়ারি) দেশটির সেনাপ্রধান আমির হাতামি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, যেকোনো সম্ভাব্য আগ্রাসন রুখে দিতে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী এখন ‘হাই অ্যালার্ট’ বা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। পারস্য উপসাগরে ওয়াশিংটনের ভারী সামরিক সরঞ্জাম ও রণতরী মোতায়েনের প্রতিক্রিয়ায় তেহরানের পক্ষ থেকে এই কঠোর বার্তা এল।
রণসজ্জায় তেহরান: সেনাপ্রধানের হুঁশিয়ারি
ইরানের সরকারি সংবাদ সংস্থা ‘ইরনা’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, আমির হাতামি এক বিবৃতিতে জানান, শত্রুপক্ষ যদি ভুল করেও কোনো হামলা চালায়, তবে তার পরিণতি হবে ভয়াবহ। তিনি বলেন, “শত্রুরা যদি আমাদের ওপর আঘাত হানার দুঃসাহস দেখায়, তবে তারা নিঃসন্দেহে নিজেদের নিরাপত্তা, এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা এবং ইহুদিবাদী শাসনব্যবস্থার (ইসরাইল) অস্তিত্বকে চরম সংকটে ফেলবে।” হাতামি জোর দিয়ে বলেন, ইরানের সামরিক বাহিনী বর্তমানে সম্পূর্ণ রক্ষণাত্মক এবং রণপ্রস্তুতির তুঙ্গে রয়েছে।
পারমাণবিক সক্ষমতা: অজেয় এক শক্তি
আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ বাড়িয়ে ইরানি সেনাপ্রধান দাবি করেন, ইরানের পারমাণবিক প্রযুক্তি ও সক্ষমতা কোনোভাবেই নির্মূল করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, “এমনকি আমাদের বিজ্ঞানী এবং বীর সন্তানরা যদি শহীদও হন, তবুও এই দেশ যে বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষ অর্জন করেছে, তা ধ্বংস করা যাবে না।” উল্লেখ্য যে, বিগত বছরগুলোতে ইসরাইলি হামলায় ইরানের বেশ কয়েকজন শীর্ষ পরমাণু বিজ্ঞানী ও সামরিক কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন, যার ফলে দুই দেশের বৈরিতা এক চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে।
ওয়াশিংটনের সামরিক কৌশল ও ট্রাম্পের বার্তা
সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ বিমানবাহী রণতরীর নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী নৌ-স্ট্রাইক গ্রুপ (Strike Group) পাঠিয়েছে ওয়াশিংটন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইঙ্গিত দিয়েছে যে, তেহরানের ওপর সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না, বিশেষ করে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে কড়াকড়ি আরোপের পর থেকে উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
তবে সামরিক হুমকির পাশাপাশি ট্রাম্প আলোচনার টেবিলে বসার পথও খোলা রাখতে চেয়েছেন। শুক্রবার তিনি এক বিবৃতিতে বলেন, তিনি আশা করছেন ইরান সামরিক সংঘাত এড়িয়ে পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে নতুন কোনো চুক্তিতে আসার চেষ্টা করবে।
ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা নিয়ে আপসহীন ইরান
যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার প্রস্তাব দিলেও ইরানের অবস্থান অত্যন্ত অনড়। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তেহরান পারমাণবিক ইস্যুতে আলোচনা করতে প্রস্তুত থাকলেও তাদের ‘ব্যালিস্টিক মিসাইল’ (Ballistic Missile) বা সামগ্রিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কোনো প্রকার আপস করা হবে না। ইরান স্পষ্ট করেছে, যদি তাদের ওপর হামলা হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি, জাহাজ এবং তাদের প্রধান আঞ্চলিক মিত্র ইসরাইল হবে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের প্রাথমিক লক্ষ্যবস্তু।
বিগত সংঘাতের প্রেক্ষাপট
প্রসঙ্গত, গত জুন মাসে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার পর থেকেই পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। ওই ১২ দিনের সংক্ষিপ্ত যুদ্ধে ইরানের বিভিন্ন সামরিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বর্তমানের এই উচ্চ সতর্কবার্তা সেই পুরোনো ক্ষতের রেশ ধরে এক বৃহত্তর যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি করছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলের বর্তমান পরিস্থিতি কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং বিশ্ব রাজনীতি ও জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতাকেও হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের এই ‘স্নায়ুযুদ্ধ’ শেষ পর্যন্ত সরাসরি সংঘাতে রূপ নেয় কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।