মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে (Geopolitics) বইছে প্রবল পরিবর্তনের হাওয়া। প্রকাশ্যে উত্তেজনা প্রশমনের কথা বললেও পর্দার আড়ালে সুর বদলাচ্ছে সৌদি আরব। ওয়াশিংটনে এক অত্যন্ত উচ্চপর্যায়ের গোপন বৈঠকে সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেছেন, ইরানকে এখনই দমানো না গেলে তেহরান ভবিষ্যতে আরও নিয়ন্ত্রহীন ও বেপরোয়া হয়ে উঠবে। বৈঠকের বিষয়ে অবগত একাধিক সূত্রের বরাতে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে।
গোপন বৈঠকের নেপথ্যে: রিয়াদের কৌশলী অবস্থান
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ছোট ভাই এবং তাঁর সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে পরিচিত খালিদ বিন সালমান সম্প্রতি ওয়াশিংটন সফরে যান। সেখানে হোয়াইট হাউসে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং জয়েন্ট চিফস চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেন তিনি। আলোচনার মূল বিষয়বস্তু ছিল ইরানে সম্ভাব্য মার্কিন সামরিক অভিযান (Military Strike)।
বৈঠক সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, প্রিন্স খালিদ স্পষ্ট ভাষায় ওয়াশিংটনকে বার্তা দিয়েছেন যে, দীর্ঘ সময় ধরে সামরিক হুমকির পর ট্রাম্প যদি এখন পিছু হটেন, তবে তা তেহরানকে একপ্রকার ‘বিজয়’ উপহার দেওয়ার শামিল হবে। এতে ইরানের সরকার আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে, যা গোটা অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য চরম ঝুঁকি তৈরি করবে।
প্রকাশ্যে শান্তি, গোপনে কঠোরতা: দ্বিচারিতার সমীকরণ?
রিয়াদের এই গোপন অবস্থান তাদের প্রকাশ্য বক্তব্যের ঠিক বিপরীত। মাত্র কয়েক দিন আগেই ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ফোনালাপে সৌদি যুবরাজ জানিয়েছিলেন, ইরানে হামলার জন্য তারা সৌদি আকাশসীমা ব্যবহার করতে দেবে না। রিয়াদ জনসমক্ষে বারবার কূটনৈতিক সমাধানের (Diplomatic Solution) ওপর জোর দিলেও ওয়াশিংটনে খালিদ বিন সালমানের বার্তা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সৌদি আরব এখন এক কঠিন ‘স্ট্র্যাটেজিক ডাইলেমা’ বা উভয় সংকটে রয়েছে। তাদের ভয়, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানে বড় ধরনের হামলা করে তবে তার পাল্টা আঘাত সৌদি আরবের ওপরও আসতে পারে। আবার হামলা না হলে ইরান এই অঞ্চলে একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে উঠবে। এই পরিস্থিতিতে সৌদিরা হয়তো ট্রাম্পের সংকল্প পরীক্ষা করছে অথবা আসন্ন যুদ্ধের ময়দানে নিজেদের অবস্থান নিরাপদ করতে চাইছে।
ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত ও কূটনৈতিক শূন্যতা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চলে বিশাল সামরিক শক্তি মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছেন। তবে হোয়াইট হাউস (White House) এখনো বলছে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তারা কূটনৈতিক পথ খোলা রাখতে চায়। যদিও বাস্তব পরিস্থিতি বলছে ভিন্ন কথা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বর্তমানে কার্যকর কোনো আলোচনার পথ খোলা নেই। আমেরিকার দেওয়া কঠোর শর্ত মেনে নিয়ে তেহরান কোনো চুক্তিতে পৌঁছাবে—এমন লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না।
উপসাগরীয় অঞ্চলের এক কর্মকর্তা পরিস্থিতির গভীরতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, "ইরান চুক্তি করতে চায় ঠিকই, কিন্তু তারা চায় তাদের নিজস্ব শর্তে। অন্যদিকে আমেরিকা যে শর্ত দিচ্ছে, তা মেনে নেওয়া ইরানের বর্তমান নেতৃত্বের জন্য অসম্ভব। এই অমিলই সংঘাতকে অনিবার্য করে তুলছে।"
ইসরায়েল ও আঞ্চলিক সমীকরণের পরিবর্তন
ওয়াশিংটনের বৈঠকে খালিদ বিন সালমান কেবল ইরান নিয়ে কথা বলেননি, বরং আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়েও স্পষ্টীকরণ দিয়েছেন। তিনি সাফ জানিয়েছেন, সৌদি আরব ইসরায়েল থেকে দূরে সরে যাচ্ছে না এবং মুসলিম ব্রাদারহুডের মতো রাজনৈতিক গোষ্ঠীর দিকেও তাদের ঝোঁকার কোনো সম্ভাবনা নেই। যদিও সৌদি সামাজিক মাধ্যমে ক্রমবর্ধমান ইসরায়েলবিরোধী মনোভাব নিয়ে মার্কিন প্রতিনিধিরা উদ্বেগ প্রকাশ করেন, তবে প্রিন্স খালিদ সেগুলোকে গুরুত্বহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
যুদ্ধের মেঘ ও আগামী দিনের আশঙ্কা
পুরো মধ্যপ্রাচ্য এখন এক আগ্নেয়গিরির মুখে দাঁড়িয়ে আছে। তেহরান ইতোমধ্যে হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, তাদের ওপর কোনো আঘাত এলে তার জবাব হবে ‘নজিরবিহীন’। অন্যদিকে, সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এই গোপন সফরের পর এটা স্পষ্ট যে, আঞ্চলিক শক্তিগুলো এখন যুদ্ধের সম্ভাবনাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। ট্রাম্পের পরবর্তী পদক্ষেপ কেবল ইরান নয়, বরং দশকের পর দশক ধরে চলে আসা মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য চিরতরে বদলে দিতে পারে।