বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি পর্যায়ে কার্যকর ও ধারাবাহিক সচেতনতা কার্যক্রমের অভাবই এর অন্যতম প্রধান কারণ। বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে ক্যানসার বিষয়ে অজ্ঞতা মানুষকে নীরবে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
আজ বিশ্ব ক্যানসার দিবস।
প্রতিবছর ৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালন করা হয়। দিবসটি পালনের উদ্দেশ্য হলো মারাত্মক ও প্রাণঘাতী ক্যানসার রোগ সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং আক্রান্তদের সহায়তায় মানুষকে উৎসাহিত করা। ২০২৬ সালে বিশ্ব ক্যানসার দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, ‘United by Unique’। প্রতিটি নাগরিকের শারীরিক বৈশিষ্ট্য, পরিবেশগত ঝুঁকি এবং আর্থ-সামাজিক অবস্থান আলাদা বা ‘অনন্য’।
ভিন্নতা সত্ত্বেও নাগরিকের জীবন রক্ষার প্রশ্নে রাষ্ট্রকে হতে হবে ‘ঐক্যবদ্ধ’, এই বার্তাই প্রতিপাদ্যের মূল কথা। ‘ইউনিয়ন ফর ইন্টারন্যাশনাল ক্যানসার কন্ট্রোল’ নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে সারা বিশ্বে এই দিবস পালন করা হয়। প্রতিষ্ঠানটি আগে ‘ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অ্যাগেইনস্ট ক্যানসার’ নামে পরিচিত ছিল।
ক্যানসার একটি দীর্ঘমেয়াদি ও প্রাণঘাতী রোগ হলেও সময়মতো সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করলে এই রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
বাংলাদেশে ক্যানসারে মৃত্যুর হার বেড়ে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো সচেতনতার অভাব। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, দেশে প্রতি বছর অসংক্রামক রোগে ৬৭ শতাংশ মানুষের মৃত্যু হয়। অসংক্রামক রোগজনিত মৃত্যুর মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ক্যানসার। ৩০ শতাংশ মানুষের মৃত্যু হয় হৃদরোগে এবং ক্যানসারে মৃত্যুবরণ করে ১২ শতাংশ মানুষ।
গ্লোবাল ক্যানসার অবজারভেটরির তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে ২০২২ সালে ক্যানসারে ১ লাখ ১৬ হাজার ৫৯৮ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং নতুন করে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছে ১ লাখ ৬৭ হাজার ২৫৬ জন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যানসার আক্রান্তের সংখ্যা ও মৃত্যুহার বেশি হওয়ার প্রধান কারণ দুটি। প্রথমত, ক্যানসার প্রতিরোধে সচেতনতার অভাব। দ্বিতীয়ত, রোগের শেষ পর্যায়ে পৌঁছানোর পর চিকিৎসা গ্রহণ করা, যখন নিরাময় তো দূরের কথা, চিকিৎসাই প্রায় দুরূহ হয়ে পড়ে। দেরিতে চিকিৎসা নেওয়ার পেছনেও মূলত অচেতনতাই দায়ী।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ক্যানসার প্রতিরোধের কার্যকর উপাদানগুলোর মধ্যে প্রথমেই জনগণের মধ্যে ব্যাপকভাবে ক্যানসার বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, দেশের জনগণকে ক্যানসার স্ক্রিনিংয়ের আওতায় আনতে হবে। সর্বশেষ, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ক্যানসার চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী করতে হবে।
সচেতনতার ঘাটতি
দেশের জনগণকে ক্যানসার বিষয়ে সচেতন করতে সরকারি উদ্যোগের চরম ঘাটতি রয়েছে। যৎসামান্য যে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হয়, তা মূলত দিবসকেন্দ্রিক আলোচনা সভা ও র্যালির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। প্রান্তিক পর্যায়ে ক্যানসার বিষয়ে কার্যকর সচেতনতা কার্যক্রম প্রায় অনুপস্থিত।
অপর্যাপ্ত স্ক্রিনিং
বিভিন্ন ক্যানসার দিবসকে কেন্দ্র করে হাসপাতালভিত্তিক সপ্তাহ বা মাসব্যাপী স্ক্রিনিং কার্যক্রম পরিচালিত হয়, যা দেশের মোট জনগোষ্ঠীর চাহিদার তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। এসব স্ক্রিনিং কার্যক্রমের তথ্য দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকাংশ মানুষ জানেই না। ফলে তারা স্ক্রিনিংয়ের আওতার বাইরে থেকে যায়। আবার অনেকেই সচেতনতার অভাবে কুসংস্কারের বশবর্তী হয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে অনাগ্রহী।
ব্যয়বহুল চিকিৎসা
সচেতনতার অভাব এবং সময়মতো স্ক্রিনিং না করানোর ফলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ক্যানসার ধরা পড়ে নানা শারীরিক জটিলতাসহ শেষ পর্যায়ে। তখন চিকিৎসা ব্যয় ও মৃত্যুঝুঁকি উভয়ই অনেক বেড়ে যায়। অতিরিক্ত চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে অনেকের পক্ষেই চিকিৎসা গ্রহণ সম্ভব হয় না। আবার কেউ কেউ মাঝপথেই চিকিৎসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন। অথচ সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যানসার শনাক্ত করা গেলে তুলনামূলক কম খরচে নিরাময় সম্ভব।
সরকারি উদ্যোগে ক্যানসার বিষয়ে সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ক্যানসার রোগতত্ত্ব বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান এবং গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক ক্যানসার হাসপাতালের প্রকল্প সমন্বয়কারী অধ্যাপক ডা. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন বাংলানিউজকে বলেন, ক্যানসার সচেতনতা বিষয়ে সত্যিকার অর্থে সরকারের দৃশ্যমান কোনো কর্মসূচি নেই। কার্যকর সচেতনতামূলক কার্যক্রমও নেই।
কার্যকর উদ্যোগের বিষয়ে তিনি বলেন, সরকারের একটি বিশেষ সেল থাকতে হবে। ক্যানসার বিষয়ে যেসব সংগঠন কাজ করছে, তাদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার মধ্যে অর্থবহ অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে হবে। যেসব সংগঠন ক্যানসার বিষয়ে ভালো কাজ করছে, তাদের জন্য বাজেট বরাদ্দ প্রয়োজন। হাসপাতালভিত্তিক কার্যক্রমের পাশাপাশি এলাকাভিত্তিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালাতে হবে। ক্যানসার চিকিৎসা বিকেন্দ্রীকরণ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দিতে হবে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব হেলথ সায়েন্সেসের সাবেক উপাচার্য ও স্বাস্থ্যখাত সংস্কার কমিশনের সদস্য বিশিষ্ট চিকিৎসাবিজ্ঞানী অধ্যাপক ডা. লিয়াকত আলী বাংলানিউজকে বলেন, আমাদের দেশে ক্যানসারের প্রাথমিক পর্যায়ে স্ক্রিনিং ও শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া অত্যন্ত দুর্বল। কমিউনিটি পর্যায়ে প্রাইমারি হেলথ কেয়ারকে শক্তিশালী করে ক্যানসার স্ক্রিনিং ও ডিটেকশনে জোর দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, অধিকাংশ ক্যানসার যেন প্রাথমিক পর্যায়েই শনাক্ত করা যায় এবং অগ্রসর পর্যায়ে না পৌঁছায়, সে ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রাথমিক অবস্থায় ক্যানসার শনাক্ত হলে চিকিৎসা ব্যয় কম হয়। এজন্য সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্ক্রিনিংয়ের আওতা সম্প্রসারণ জরুরি।