ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এখন প্রধান আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু—প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে সম্পাদিত বিতর্কিত এক বাণিজ্য চুক্তি। এই চুক্তিকে কেন্দ্র করে ভারতের সংসদ থেকে রাজপথ, সর্বত্রই তোপের মুখে পড়েছে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার। বিশেষ করে চুক্তির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নয়াদিল্লির বদলে ট্রাম্পের নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ (Truth Social) থেকে আসায় মোদি সরকারের কূটনৈতিক সক্ষমতা এবং স্বচ্ছতা নিয়ে কড়া প্রশ্ন তুলেছে বিরোধী দল কংগ্রেস।
ট্রাম্পের ঘোষণা ও চাঞ্চল্যকর শর্তসমূহ চলতি বাজেট অধিবেশনের মাঝেই উত্তাপ ছড়িয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট। ট্রাম্প দাবি করেছেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিশেষ অনুরোধে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি বিশালাকৃতির ‘ট্রেড ডিল’ (Trade Deal) সম্পন্ন হয়েছে। ট্রাম্পের ভাষ্যমতে, এই চুক্তির আওতায় ভারত রাশিয়ার পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি তেল কিনবে। এছাড়া, মার্কিন পণ্যের ওপর থেকে অতিরিক্ত শুল্ক (Tariff) কমিয়ে প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে নয়াদিল্লি।
বিরোধী দলগুলোর প্রশ্ন, এত বড় একটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের ঘোষণা ভারত সরকার কেন আগে করল না? কেন দেশের মানুষকে অন্ধকারে রেখে মার্কিন প্রেসিডেন্টের মাধ্যমে এই তথ্য জানতে হলো? কংগ্রেসের অভিযোগ, এটি ভারতের ‘কূটনৈতিক অযোগ্যতা’ এবং সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে বড় ধরনের আপস।
কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সংকট চুক্তির কোনো লিখিত দলিল এখনো জনসমক্ষে আনা হয়নি। তবে ট্রাম্পের বক্তব্যে যে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, তাতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও বিরোধী নেতারা। অভিযোগ উঠেছে, মার্কিন কৃষি পণ্যের জন্য ভারতের বাজার অবারিত করে দেওয়ার শর্ত রয়েছে এই চুক্তিতে। যদি মার্কিন কৃষি পণ্য কোনো বাধা ছাড়াই ভারতের বাজারে প্রবেশ করে, তবে ভারতের কোটি কোটি প্রান্তিক কৃষক এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা (SMEs) অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়বেন। দেশীয় কৃষিখাতে ‘মার্কেট ক্র্যাশ’ হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশেষজ্ঞরা।
তেল রাজনীতি ও অর্থনৈতিক প্রভাব ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে ডিসকাউন্ট মূল্যে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল কিনে আসছিল, যা ভারতের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রেখেছে। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, ভারত যদি এখন রাশিয়ার বদলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে চড়া দামে তেল কেনে, তবে সরাসরি তার প্রভাব পড়বে পেট্রোল-ডিজেলের দামে। এর ফলে ভারতের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ও পরিবহন খরচ এক লাফে অনেক বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে চুক্তির প্রেক্ষাপট যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) সঙ্গেও একটি বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করেছে ভারত। সেখানে প্রায় ৯৬.৬ শতাংশ পণ্যে শুল্ক কমানো বা পুরোপুরি তুলে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। একই সময়ে বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনৈতিক জোটের সাথে এমন চুক্তি ভারতীয় শিল্প ও কৃষি ক্ষেত্রের জন্য ‘ডাবল শক’ (Double Shock) হিসেবে দেখা দিচ্ছে বলে বিরোধীদের দাবি।
সংসদে জবাবদিহিতার দাবি কংগ্রেস নেতৃত্ব অবিলম্বে এই চুক্তির পূর্ণাঙ্গ শর্তাবলি সম্বলিত ‘হোয়াইট পেপার’ বা শ্বেতপত্র প্রকাশের দাবি জানিয়েছে। তাদের মতে, গত বছরের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধবিরতির খবরও ট্রাম্প আগে জানিয়েছিলেন, যা ভারতের পররাষ্ট্রনীতির জন্য অবমাননাকর ছিল। এবারও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটায় সরকারের ‘গোপন কূটনীতি’ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
ভারতের কৃষক, দেশীয় শিল্প এবং সাধারণ মানুষের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে কেন এই চুক্তি করা হলো, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা এখন সংসদের দুই কক্ষেই দাবি করছে বিরোধীরা। জনস্বার্থ ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নটি এখানে মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।