নয়াদিল্লি ও ওয়াশিংটনের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে চলেছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আগামী মার্চের মাঝামাঝি সময়ে স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রস্তাবিত সেই মেগা বাণিজ্য চুক্তি। কেন্দ্রীয় বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল বৃহস্পতিবার (৫ জানুয়ারি) এই ঘোষণা দিয়ে জানিয়েছেন, এই চুক্তি বিশ্ব অর্থনীতিতে ভারতের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে।
ট্রাম্পের ঘোষণা ও ২০৩০-এর লক্ষ্যমাত্রা গত সোমবার রাতে নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ (Truth Social) একটি পোস্টের মাধ্যমে এই চুক্তির ইঙ্গিত দিয়েছিলেন নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্পের সেই ঘোষণাকে বাস্তবে রূপ দিতেই এবার তৎপর দুই দেশ। কূটনৈতিক মহলের মতে, এটি কেবল একটি সাধারণ চুক্তি নয়, বরং ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যকে ৫০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করার যে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে, এটি তার প্রথম বড় পদক্ষেপ। আগামী পাঁচ দিনের মধ্যে এ বিষয়ে একটি বিস্তারিত 'জয়েন্ট স্টেটমেন্ট' বা যৌথ বিবৃতি জারি করা হবে বলে জানিয়েছেন পীযূষ গোয়েল।
রাশিয়ার তেলের বদলে আমেরিকার প্রযুক্তি ও জ্বালানি এই চুক্তির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো ভূ-রাজনৈতিক ও জ্বালানি নীতির আমূল পরিবর্তন। চুক্তি অনুযায়ী, ভারত রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল কেনা বন্ধ করার পথে হাঁটবে। এর পরিবর্তে আমেরিকা থেকে ৫০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের জ্বালানি এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তি পণ্য (Technology Products) আমদানির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে নয়াদিল্লি। ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই শিফট অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রতিদান হিসেবে ভারতও বড় সুবিধা পাচ্ছে আমেরিকার বাজারে। মার্কিন প্রশাসন ভারতীয় পণ্যের ওপর বিদ্যমান পারস্পরিক শুল্ক (Reciprocal Tariffs) ১৮ শতাংশ কমিয়ে আনার আশ্বাস দিয়েছে। এর ফলে ভারতের আইটি, টেক্সটাইল এবং ইঞ্জিনিয়ারিং খাতের পণ্যগুলো মার্কিন বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে এবং ভারতের রপ্তানি আয় বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
সংসদে হট্টগোল ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতি তবে এই মেগা ডিল (Mega Deal) নিয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে উত্তাপ ছড়িয়েছে। গতকাল লোকসভায় পীযূষ গোয়েল যখন এই চুক্তির রূপরেখা পেশ করতে যান, তখন বিরোধীদের প্রবল বিক্ষোভের মুখে পড়তে হয় তাঁকে। বিরোধীদের প্রধান অভিযোগ, রাশিয়ার তেলের মতো সস্তা বিকল্প ছেড়ে আমেরিকার ওপর নির্ভরশীল হওয়া এবং চুক্তির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। বিশেষ করে কেপলারের (Kpler) তথ্য অনুযায়ী, ভারত ২০২৫ সালেই রাশিয়ার থেকে প্রায় ২ কোটি ১০ লক্ষ ব্যারেল তেল সংগ্রহ করেছে— সেই বিশাল সরবরাহ হঠাৎ বন্ধ হলে তার প্রভাব কী হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধী নেতারা।
অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও কর্মসংস্থান বিরোধীদের সমালোচনার জবাবে পীযূষ গোয়েল জানান, এই চুক্তি ভারতের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন (Domestic Production) বা 'মেক ইন ইন্ডিয়া' প্রকল্পকে অভাবনীয় গতি দেবে। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, স্থবির হয়ে পড়া এমএসএমই (MSME) খাতের জন্য এটি একটি সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করবে। উন্নত মার্কিন প্রযুক্তি এবং সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের (FDI) ফলে দেশে নতুন নতুন কর্মসংস্থান (Job Creation) সৃষ্টি হবে এবং ভারতীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলো গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনের অংশ হয়ে উঠবে।
ভবিষ্যৎ রূপরেখা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চুক্তি কেবল বাণিজ্যিক নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের কৌশলগত অবস্থানকেও সুসংহত করবে। সেমিকন্ডাক্টর, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) এবং ডেটা সেন্টারের (Data Center) মতো উদীয়মান ক্ষেত্রগুলোতে মার্কিন বিনিয়োগের রাস্তা প্রশস্ত হবে। এখন দেখার বিষয়, আগামী পাঁচ দিনের মধ্যে প্রকাশিতব্য যৌথ বিবৃতিতে এই বিশাল অংকের লেনদেন এবং তেল আমদানির বিকল্প উৎস নিয়ে সরকার কী বিশদ ব্যাখ্যা দেয়।
সূত্র: এনডিটিভি