• বিনোদন
  • ৫ দশক পরেও প্রাসঙ্গিক 'সূর্যকন্যা', ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চলচ্চিত্র উৎসবে আবেগপ্রবণ দর্শক

৫ দশক পরেও প্রাসঙ্গিক 'সূর্যকন্যা', ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চলচ্চিত্র উৎসবে আবেগপ্রবণ দর্শক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদের উদ্যোগে আয়োজিত 'আমার ভাষার চলচ্চিত্র' উৎসবে আলমগীর কবীর পরিচালিত ক্লাসিক সিনেমা 'সূর্যকন্যা' দেখতে ভিড় করেন দর্শক। ছবিটি মুক্তির ৫০ বছর পরও এর প্রাসঙ্গিকতা ধরে রেখেছে।

বিনোদন ১ মিনিট পড়া
৫ দশক পরেও প্রাসঙ্গিক 'সূর্যকন্যা', ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চলচ্চিত্র উৎসবে আবেগপ্রবণ দর্শক

ভাষা আন্দোলনের চেতনায় প্রতিবছরের মতো এবারও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে (টিএসসি) আয়োজন করা হয়েছে 'আমার ভাষার চলচ্চিত্র' উৎসব। ৩ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই উৎসবের দ্বিতীয় দিনে দর্শক মহলে দারুণ সাড়া ফেলে আলমগীর কবীর পরিচালিত ১৯৭৫ সালের ছবি 'সূর্যকন্যা'। এই ক্লাসিক সিনেমা দেখতে এসে পুরোনো দিনের স্মৃতিতে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন অনেক বয়োজ্যেষ্ঠ দর্শক।

টিএসসিতে উৎসবমুখর পরিবেশ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদের উদ্যোগে আয়োজিত এই উৎসব চলবে আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। দ্বিতীয় দিন অর্থাৎ বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) টিএসসিতে ঢুকতেই শোনা যায় প্রয়াত খালিদ হাসান মিলুর কণ্ঠে জনপ্রিয় গান, ‘সেই মেয়েটি আমাকে ভালোবাসে কি না, আমি জানি না’। 'মৌসুমী' সিনেমার এই গান দিয়েই যেন আয়োজকেরা দর্শকদের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করছিলেন। এরপর একে একে আরও অনেক বাংলা সিনেমার গান বাজতে থাকে। টিকিট কাউন্টারে ছিল লম্বা লাইন, যেখানে পরিবার নিয়ে বা একাও এসেছেন অনেকে। টিএসসির আঙিনাজুড়ে ছিল এক উৎসবমুখর আবহ। এদিন সুনীল বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'দেয়া নেয়া' ছবিটির প্রদর্শনী দিয়ে শুরু হয়। তবে দর্শকের মূল আগ্রহ ছিল দুপুর সাড়ে ১২টার শিডিউলে থাকা আলমগীর কবীরের 'সূর্যকন্যা' সিনেমাটিকে ঘিরে।

দর্শক প্রতিক্রিয়ায় নস্টালজিয়া

'সূর্যকন্যা' দেখতে আসা দর্শকদের মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। তাদের মধ্যে একজন মল্লিকা দাস, যিনি স্বামী, বোন ও কন্যাকে সঙ্গে নিয়ে ছবিটি দেখতে এসেছেন। তিনি বলেন, “ছোটবেলায় সিনেমাটা দেখেছিলাম। এখানে আবার বড় পর্দায় দেখাবে শুনে সবাই মিলে চলে এলাম। তখন মায়ের সঙ্গে গিয়েছিলাম, এবার মেয়েকে নিয়ে এলাম।” তার স্বামী নিরঞ্জন দাসের মতে, আলমগীর কবীরের মতো আধুনিক নির্মাণ এখনকার নির্মাতারা কল্পনাও করতে পারবেন না। উত্তরা থেকে আসা কৃষি কর্মকর্তা সবুর হোসেনও একই কথা বলেন। তিনি উল্লেখ করেন, আলমগীর কবীর, বুলবুল আহমেদ, গোলাম মুস্তাফা থেকে শুরু করে জয়শ্রী কবিরের মতো শিল্পীরা একে একে চলে গেলেও, তাঁদের কাজ চিরকাল রয়ে গেছে।

'সূর্যকন্যা' চলচ্চিত্রের বার্তা ও নির্মাণশৈলী

বেলা ১টায় শুরু হওয়া এ সিনেমায় প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন বুলবুল আহমেদ, গোলাম মুস্তাফা, সুমিতা দেবী, জয়শ্রী কবির ও রাজশ্রী বোস। ছবিতে বুলবুল আহমেদ অভিনীত লেনিন একজন স্বপ্নবান চিত্রশিল্পী, যে ডাক্তার হওয়ার পারিবারিক আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে শিল্পকেই বেছে নেয়। লেনিন বিশ্বাস করে, রঙ-তুলির শক্তিতেই সম্ভব নতুন মানবিক পৃথিবী গড়া। সে রেসকোর্স ময়দানে দাঁড়িয়ে সবার জন্য খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার স্বপ্ন দেখে। ছবিতে লেনিন একটি পুতুলের প্রেমে পড়ে, যার নাম দেয় 'লাবণ্য'। এই পুতুলের মুখ দিয়েই পরিচালক পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর দমিত আকাঙ্ক্ষা ও নিপীড়নের কথা তুলে ধরেছেন। এটি যেন নারীকে বস্তুতে পরিণত করার সমাজের প্রতিচ্ছবি। অন্যদিকে, ছবিতে রাসেল চরিত্রে নারীর প্রতি ভোগের মনোভাব এবং মনিকা চরিত্রে নারীর স্বাধীনচেতা ও আত্মবিশ্বাসী অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে 'আমি যে আঁধারের বন্দিনী' গানটি এখানে নারী মুক্তির প্রতীক হিসেবে কাজ করেছে। এই ১০৮ মিনিটের চলচ্চিত্রের মূল বার্তা হলো নারীচেতনা ও শিকল ভাঙার আকাঙ্ক্ষা।

প্রযুক্তি ও প্রাসঙ্গিকতা

ছবিটির সংগীত করেছেন সত্য সাহা। তাঁর সংগীতে বাস্তব ও কল্পনার দৃশ্যপটজুড়ে এক বিশেষ মুনশিয়ানা ফুটে উঠেছে। এম এ মবিনের চিত্রগ্রহণ পাঁচ দশক আগের ঢাকা, যেমন—রেসকোর্স ময়দান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শাহবাগ থেকে বিমানবন্দরের দৃশ্যপট ফুটিয়ে তুলেছে, যা দর্শকদের টাইম ট্রাভেলের অনুভূতি দেয়। আলমগীর কবীরের 'সূর্যকন্যা' আজও প্রাসঙ্গিক। মুক্তির ৫০ বছর পরও ছবিটি যে এখনো জীবন্ত, এই প্রদর্শনীই তার প্রমাণ।

উৎসবের অন্যান্য আকর্ষণ

'আমার ভাষার চলচ্চিত্র' উৎসবে নতুন ও পুরোনো মিলিয়ে মোট ২০টি পূর্ণদৈর্ঘ্য ও ৩টি স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমা দেখানো হচ্ছে। 'সূর্যকন্যা'র পর গতকাল প্রদর্শিত হয় শরাফ আহমেদের 'চক্কর ৩০২' ও রায়হান রাফীর 'তাণ্ডব'। আজ (৫ ফেব্রুয়ারি) উৎসবের তৃতীয় দিনে প্রদর্শিত হবে সালাউদ্দিন পরিচালিত 'রূপবান', সাদিক আহমেদের 'দ্য লাস্ট ঠাকুর', পিপলু খানের 'জয়া আর শারমিন' ও মনিরুল হক পরিচালিত 'ইউনিভার্সিটি অব চানখাঁরপুল'। ছাত্ররাজনীতি ও গণরুমের গল্প নিয়ে নির্মিত ছবিটি ২৪তম ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশ প্যানোরামা বিভাগে সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার পেয়েছে।

Tags: dhaka university ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় film festival surjokonna বাংলা সিনেমা ঢালিউড চলচ্চিত্র উৎসব