• জাতীয়
  • বৈষম্যহীন ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গড়তে ‘ইনসাফ’ কায়েমের ডাক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মতবিনিময়

বৈষম্যহীন ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গড়তে ‘ইনসাফ’ কায়েমের ডাক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মতবিনিময়

জাতীয় ১ মিনিট পড়া
বৈষম্যহীন ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গড়তে ‘ইনসাফ’ কায়েমের ডাক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মতবিনিময়

চব্বিশের অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাষ্ট্র সংস্কার ও আগামী নির্বাচনে সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব নির্বাচনের গুরুত্ব নিয়ে ঢাবি শিক্ষকদের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা।

একটি ন্যায়ভিত্তিক, বৈষম্যহীন এবং দুর্নীতিমুক্ত ‘ইনসাফভিত্তিক’ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষকরা এক গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভায় মিলিত হয়েছেন। বক্তারা জোর দিয়ে বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় মহানবী (সা.) এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের আদর্শকে ধারণ করে সৎ, যোগ্য ও দক্ষ নেতৃত্ব নির্বাচন করা এখন সময়ের দাবি। তারা মনে করেন, চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা পূরণে রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি স্তরে আমূল সংস্কার এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের অধ্যাপক আবদুল্লাহ ফারুক হলে এই বিশেষ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। ‘ইউনিভার্সিটি টিচার্স কনসর্টিয়াম’ (UTC) এবং যুক্তরাজ্যভিত্তিক ‘সেন্টার ফর গ্লোবাল থট’ (Center for Global Thought) যৌথভাবে ‘ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ভাবনা’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

বিদেশে অর্থ পাচার ও সুশাসনের সংকট অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক এবং ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মো. শামছুল আলম। তিনি গত কয়েক দশকে দেশের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের চিত্র তুলে ধরে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ড. আলম বলেন, “বিগত সরকারের আমলে প্রায় ২৮ লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচারের তথ্য আমাদের শিউরে দেয়। এই বিশাল 'Capital Flight' বা অর্থ পাচার আমাদের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়েছে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে এত রক্তপাতের পরও আমরা কাঙ্ক্ষিত সুন্দর সমাজ পাইনি। এখন সময় এসেছে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার, আর এই দায়িত্ব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরই নিতে হবে।” তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ এমন শাসক চায় যাদের কোনো বিদেশি ‘প্রভু’ থাকবে না এবং যারা কেবল দেশের মানুষের জন্য কাজ করবেন।

রাষ্ট্র সংস্কার ও জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন মতবিনিময় সভায় বিভিন্ন বিভাগের চেয়ারম্যান ও জ্যেষ্ঠ শিক্ষকরা রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে তাদের সুনির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণ (Observations) তুলে ধরেন। বিশ্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. আবু সায়েম বলেন, “চব্বিশের অভ্যুত্থান আমাদের সামনে একটি ঐতিহাসিক সুযোগ এনে দিয়েছে। তবে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন এখনো দৃশ্যমান নয়। একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে, যাতে 'Public Aspirations' বা জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটে।”

অর্থনৈতিক মুক্তি ও কল্যাণ রাষ্ট্র গঠন ফিন্যান্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোশারফ হোসেন একটি প্রকৃত ‘কল্যাণ রাষ্ট্র’ (Welfare State) গঠনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, “ভীতিমুক্ত সমাজ গঠনে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং সম্পদের সুষম বণ্টন অপরিহার্য। নাগরিকদের অন্যায়ের প্রতিবাদ করার অধিকার এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে 'Financial Integrity' বা আর্থিক সততা নিশ্চিত না করলে বৈষম্য দূর করা সম্ভব নয়।”

অন্যদিকে, ব্যাংকিং এন্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. শহিদুল ইসলাম স্বাধীনতার দীর্ঘ ৫৫ বছর পর মানুষের মৌলিক অধিকার (Basic Rights) বঞ্চিত হওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “দেশের সম্পদ যেন কেবল এ দেশের মানুষের কল্যাণে ব্যয় হয়। বিদেশি শক্তির কাছে মাথা নত করে ক্ষমতায় থাকার অপরাজনীতি বন্ধ করতে হবে। আমাদের লক্ষ্য হতে হবে একটি সার্বভৌম ও আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ।”

নেতৃত্বের গুণাবলি ও নৈতিকতা সভায় বক্তারা একমত হন যে, কেবল বক্তৃতার মঞ্চে সুন্দর কথা বললে দেশ পরিবর্তন হয় না। রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রয়োজন নৈতিকতা ও পেশাদারিত্বের সমন্বয়। সৎ ও যোগ্য নেতৃত্বের মাধ্যমেই দুর্নীতি নির্মূল করা সম্ভব। সভায় আরও বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ জহিরুল ইসলাম, অধ্যাপক ড. মো. বেলাল হোসেন, ড. মোস্তফা মনজুরসহ বিভিন্ন অনুষদের প্রথিতযশা শিক্ষকরা। তারা মনে করেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমাজকে কেবল শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ না থেকে দেশ গঠনের এই ক্রান্তিলগ্নে দিকনির্দেশনামূলক ভূমিকা পালন করতে হবে।

এই মতবিনিময় সভাটি বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে একটি তাৎপর্যপূর্ণ 'Intellectual Discourse' হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা আগামী দিনের রাষ্ট্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।