একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনালগ্নে দাঁড়িয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও ঐতিহাসিক গণভোটে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকাল ১০টার দিকে রাজধানীর গুলশান-২ এর মডেল হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে ভোট প্রদান করেন তিনি। ভোটদান শেষে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে তিনি এই দিনটিকে ‘নতুন বাংলাদেশের জন্মদিন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং দেশবাসীকে এই উৎসবে শামিল হওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানান।
দুঃস্বপ্নের অবসান ও নতুন স্বপ্নের যাত্রা
ভোটকেন্দ্র থেকে বেরিয়ে হাস্যোজ্জ্বল ড. মুহাম্মদ ইউনূস তার অনুভুতি ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, “আজকের দিনটি আমার জীবনের এক মহা আনন্দের দিন। এটি কেবল আমার জন্য নয়, বরং সমগ্র জাতির জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। আজকের এই ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে আমরা আমাদের দুঃস্বপ্নময় অতীতকে চিরতরে বর্জন করলাম। প্রতিটি পদক্ষেপে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার যে সুযোগ আমাদের সামনে এসেছে, আজ থেকেই তার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হলো।”
প্রধান উপদেষ্টা আরও যোগ করেন, “আমরা একটি উৎসবমুখর পরিবেশে এই ‘জন্মদিন’ পালন করছি। জাতি হিসেবে আমাদের এই ঐক্য ও সংকল্পই আগামীর পথপ্রদর্শক হবে।”
গণভোটের গুরুত্ব ও দেশবাসীর প্রতি আহ্বান
সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি চলমান গণভোটকে (Referendum) রাষ্ট্র সংস্কারের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন ড. ইউনূস। তিনি বলেন, “প্রার্থীবরণ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বড় হলো এই গণভোট। এর মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে বাংলাদেশের ভবিষ্যতের রূপরেখা। আমি দেশের প্রতিটি নাগরিককে এই প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। আপনাদের একটি ভোটই পাল্টে দেবে সারা বাংলাদেশের চিত্র।”
উপস্থিত সাংবাদিকদের শুভেচ্ছা জানিয়ে তিনি এক আবেগঘন পরিবেশে ‘ঈদ মোবারক’ বলে অভিবাদন জানান। তিনি মনে করেন, দীর্ঘ অপেক্ষার পর পাওয়া এই ভোটাধিকার জনগণের জন্য ঈদের আনন্দের মতোই পবিত্র ও উৎসবের।
নির্বাচনী মানচিত্র: সংখ্যা ও প্রস্তুতির পরিসংখ্যান
সারা দেশে ২৯৯টি সংসদীয় আসনে একযোগে ভোটগ্রহণ চলছে। নির্বাচন কমিশন (Election Commission) প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, সকাল সাড়ে ৭টা থেকে শুরু হওয়া এই ভোটগ্রহণ চলবে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত। এবারের নির্বাচনে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের বিশেষ নজর রয়েছে।
নির্বাচনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিচে তুলে ধরা হলো:
মোট ভোটার: ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৩ জন।
পুরুষ ও নারী ভোটার: পুরুষ ৬ কোটি ৪৮ লাখ এবং নারী ৬ কোটি ২৮ লাখ। এছাড়া হিজড়া ভোটার রয়েছেন ১ হাজার ২৩২ জন।
ভোটকেন্দ্র ও কক্ষ: সারা দেশে ৪২ হাজার ৭৭৯টি কেন্দ্রে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২টি ভোটকক্ষে ভোটগ্রহণ চলছে।
প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী: মোট ২ হাজার ২৮ জন প্রার্থী লড়াই করছেন, যার মধ্যে ১ হাজার ৭৫৫ জন রাজনৈতিক দলের এবং ২৭৩ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী।
রাজনৈতিক দল: এবারের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে ৫০টি রাজনৈতিক দল।
উল্লেখ্য, জামায়াতে ইসলামীর একজন প্রার্থীর আকস্মিক মৃত্যুর কারণে শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন স্থগিত করেছে ইসি (EC)। ফলে ২৯৯টি আসনে আজ ভোটযুদ্ধ চলছে।
কড়া নিরাপত্তা ও উৎসবের আমেজ
সকাল থেকেই ভোটকেন্দ্রগুলোতে ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে ‘New Bangladesh’ গড়ার লক্ষ্যে এক অভূতপূর্ব উদ্দীপনা দেখা দিচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারিতে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। প্রধান উপদেষ্টার ভোট প্রদানের মাধ্যমে নির্বাচনী আমেজ আরও তুঙ্গে পৌঁছেছে, যা একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।