• রাজনীতি
  • শূণ্যের কোঠায় 'কিংমেকার' এরশাদের জাপা: মহাপ্রলয়ে কেন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল লাঙ্গল?

শূণ্যের কোঠায় 'কিংমেকার' এরশাদের জাপা: মহাপ্রলয়ে কেন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল লাঙ্গল?

রাজনীতি ১ মিনিট পড়া
শূণ্যের কোঠায় 'কিংমেকার' এরশাদের জাপা: মহাপ্রলয়ে কেন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল লাঙ্গল?

রংপুরের দুর্গ থেকে রাজধানীর রাজপথ—ত্রয়োদশ নির্বাচনে জাপার নজিরবিহীন বিপর্যয়ের নেপথ্যে আদর্শিক সংকট না কি দীর্ঘদিনের 'লেজুড়বৃত্তি'? চুলচেরা বিশ্লেষণে উঠে এল চাঞ্চল্যকর তথ্য।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ধূলিঝড় থামার পর বাংলাদেশের 'পলিটিক্যাল ল্যান্ডস্কেপ' বা রাজনৈতিক মানচিত্র এখন পুরোপুরি বদলে গেছে। যেখানে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় ফিরছে এবং জামায়াতে ইসলামী ৭৭টি আসন পেয়ে সংসদে প্রধান শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, সেখানে সবচেয়ে বড় বিষ্ময় হয়ে দাঁড়িয়েছে জাতীয় পার্টির (জাপা) চূড়ান্ত পতন। যে দলটি একসময় বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘কিংমেকার’ (Kingmaker) হিসেবে পরিচিত ছিল, এই নির্বাচনে তাদের ঝুলিতে নেই একটিও আসন। সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে এরশাদের লাঙ্গল প্রতীক এমন অস্তিত্বের সংকটে আগে কখনো পড়েনি।

রংপুর দুর্গের পতন: জি এম কাদেরের শোচনীয় পরাজয়

জাতীয় পার্টির জন্য সবচেয়ে বড় আঘাতটি এসেছে তাদের আদি ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত রংপুর থেকে। দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদের রংপুর–৩ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে কেবল পরাজিতই হননি, তিনি তৃতীয় অবস্থানে নেমে গিয়েছেন। ওই আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাহবুবুর রহমান বেলাল ১ লাখ ৭৫ হাজার ৮২৭ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা বিএনপি প্রার্থীর চেয়েও প্রায় অর্ধেক ভোট পেয়ে জি এম কাদেরের এই পরাজয় জাপার তৃণমূলের ধসের প্রমাণ দেয়। যেখানে এরশাদ জেলে থেকেও পাঁচটি আসনে জিততেন, সেখানে বর্তমান চেয়ারম্যানের এই করুণ দশা দলের নেতৃত্বের দেউলিয়া অবস্থাকেই সামনে এনেছে।

সাড়ে ১৭ বছরের ‘লেজুড়বৃত্তি’ ও জনবিচ্ছিন্নতা

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় পার্টির এই ভরাডুবির প্রধান কারণ দীর্ঘ সাড়ে ১৭ বছর আওয়ামী লীগের ‘বি-টিম’ বা লেজুড়বৃত্তি করা। ভোটারদের একটি বড় অংশ মনে করে, আওয়ামী লীগের বিতর্কিত নির্বাচনগুলোকে বৈধতা দিতে জাপা গৃহপালিত বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করেছে। এই 'পজিশনাল অ্যাম্বিগুইটি' (Positional Ambiguity) বা অবস্থানগত অস্পষ্টতা দলটিকে সাধারণ মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতাহীন করে তুলেছে। যারা আওয়ামী লীগের শাসন থেকে মুক্তি চেয়েছিল, তারা জাপাকে বিকল্প হিসেবে না দেখে বিএনপি বা জামায়াতকে বেছে নিয়েছে।

ঐতিহাসিক ভোটব্যাংকের ক্ষয়: পরিসংখ্যানের করুণ চিত্র

জাপার পতনের চিত্রটি হঠাৎ করে হয়নি, বরং এটি দীর্ঘদিনের ক্ষয়ের ফলাফল:

১৯৯১: ৩৫ আসন (ভোট ১২%)

২০০১: ১৪ আসন (ভোট ৭%)

২০১৮: ২২ আসন (ভোট ৫.৫%)

২০২৪: ১১ আসন (ভোট ৩%)

২০২৬: ০ আসন!

দেখা যাচ্ছে, প্রতি নির্বাচনেই দলের গ্রাফ নিম্নমুখী ছিল। একসময় উত্তরবঙ্গের মানুষ লাঙ্গল প্রতীককে আবেগের জায়গা থেকে ভোট দিলেও বর্তমান প্রজন্মের কাছে এরশাদের সেই উত্তরাধিকার ম্লান হয়ে গেছে।

নেতৃত্ব সংকট ও অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুর পর থেকেই জাপা নেতৃত্ব নিয়ে জি এম কাদের ও রওশন এরশাদের মধ্যে যে প্রকাশ্য বিভক্তি দেখা গিয়েছিল, তা তৃণমূলের কর্মীদের মধ্যে গভীর হতাশা তৈরি করে। দলের অভিজ্ঞ নেতারা বিভিন্ন সময় পদত্যাগ করেছেন বা দল ভেঙে নতুন গ্রুপ তৈরি করেছেন। এর মধ্যে আন্দালিব রহমান পার্থের নেতৃত্বাধীন বিজেপি (BJP) বিএনপি জোটে থেকে জয়ী হলেও, মূল জাপা ছিল নেতৃত্বহীন। নির্বাচনে জয়ের জন্য যে সাংগঠনিক 'চেইন অফ কমান্ড' (Chain of Command) প্রয়োজন, জাপার তা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিল।

তরুণ ভোটার ও পরিবর্তিত জনমানস

বর্তমানের 'জেন-জে' (Gen-Z) বা নতুন প্রজন্মের ভোটারদের কাছে জাপার কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য বা ইশতেহার ছিল না। কর্মসংস্থান, শিক্ষা কিংবা ডিজিটাল অর্থনীতির (Digital Economy) মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দলটি কোনো আধুনিক কর্মসূচি দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এছাড়া, জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট দলগুলোর প্রতি জনমনে যে ঘৃণা তৈরি হয়েছিল, জাপা তার রোষানল থেকেও বাঁচতে পারেনি। কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে হামলা ও আগুনের ঘটনা দলটিকে শারীরিকভাবেও পঙ্গু করে দিয়েছিল।

উপসংহার: রাজনীতির শেষ প্রান্তে কি জাপা?

একটি রাজনৈতিক দল যখন তার 'কোর আইডেন্টিটি' (Core Identity) বা মূল পরিচয় হারিয়ে ফেলে, তখন তার অস্তিত্ব টেকা কঠিন হয়ে পড়ে। জাতীয় পার্টি না পেরেছে রাজপথের বিরোধী দল হতে, না পেরেছে সরকারের অংশ হয়ে জনগণের সেবা করতে। ফলাফল হিসেবে, এবারের নির্বাচনে ভোটাররা তাদের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করেছে। বাংলাদেশের দ্বিমুখী বা ত্রিমুখী ক্ষমতার লড়াইয়ে জাপা এখন একটি প্রান্তিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে, যার পুনরুত্থান এখন প্রায় অসম্ভব বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

Tags: bangladesh politics 13th national election jatiya party gm quader election failure ershad legacy vote analysis political collapse