আদ্দিস আবাবা থেকে বিশ্বজুড়ে সংবাদ সরবরাহকারী আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের তিন সাংবাদিকের অ্যাক্রেডিটেশন (Accreditation) বা সরকারি অনুমোদন বাতিল করেছে ইথিওপিয়া সরকার। ইথিওপিয়ান মিডিয়া অথরিটি (EMA) এই কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণের পাশাপাশি আগামী ১৪-১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ৩৯তম আফ্রিকান ইউনিয়ন (African Union) সম্মেলনের সংবাদ সংগ্রহের অনুমতিও কেড়ে নিয়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
রহস্যের মূলে একটি ‘ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্ট’ সংবাদমাধ্যমের ওপর ইথিওপিয়া সরকারের এই আকস্মিক খড়গের পেছনে গত ১০ ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত রয়টার্সের একটি চাঞ্চল্যকর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বা ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্টকে (Investigative Report) দায়ী করা হচ্ছে। ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, ইথিওপিয়া গোপনে একটি সামরিক প্রশিক্ষণ শিবির পরিচালনা করছে। সেখানে প্রতিবেশী দেশ সুদানের সরকারবিরোধী আধাসামরিক বাহিনী ‘র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস’ (RSF)-এর হাজার হাজার যোদ্ধাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
যদিও ইথিওপিয়া সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি, তবে ইএমএ’র কর্মকর্তাদের অনানুষ্ঠানিক ইঙ্গিত অনুযায়ী— ওই বিশেষ প্রতিবেদনটি প্রকাশের কারণেই সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এমন কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে।
রয়টার্সের অবস্থান ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা আকস্মিক এই নিষেধাজ্ঞার পর রয়টার্স এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা পুরো বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করছে। তবে যেকোনো পরিস্থিতিতে ‘থমসন রয়টার্স ট্রাস্ট নীতিমালা’ (Thomson Reuters Trust Principles) অনুযায়ী তারা স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং নির্ভরযোগ্য সংবাদ পরিবেশনে অবিচল থাকবে। বিশ্বজুড়ে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীরা ইথিওপিয়া সরকারের এই পদক্ষেপকে প্রেস ফ্রিডম (Press Freedom) বা সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করছেন।
সুদান সংকট: এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ইথিওপিয়ার এই পদক্ষেপ এমন এক সময়ে এলো যখন সুদানে প্রায় তিন বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধ এক ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে কর্ডফান ও দারফুরের মতো অঞ্চলগুলোতে মানবিক পরিস্থিতি চরম সংকটাপন্ন। প্যারামিলিটারি ফোর্স (Paramilitary Force) আরএসএফ এবং সরকারি বাহিনীর লড়াইয়ে আধুনিক ড্রোন হামলা ও বেসামরিক নাগরিকদের ওপর নৃশংসতা প্রতিদিন অসংখ্য সাধারণ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে।
জাতিসংঘের (United Nations) এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আরএসএফ-এর হাতে এল-ফাশার শহর দখলের সময় ব্যাপক গণহত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ (Crimes Against Humanity) সংঘটিত হয়েছে। যুদ্ধের ফলে লাখ লাখ মানুষ ঘরছাড়া হয়েছে এবং হাজার হাজার শিশু খাদ্যাভাব ও চিকিৎসার অভাবে ধুঁকছে। এই আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার মধ্যে ইথিওপিয়ার প্রশিক্ষণ শিবির পরিচালনার অভিযোগ পুরো হর্ন অব আফ্রিকা (Horn of Africa) অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতে নতুন উত্তাপ ছড়িয়েছে।
সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা ও তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করার জন্য এখন আন্তর্জাতিক মহলের চাপের মুখে আদ্দিস আবাবা। এখন দেখার বিষয়, আফ্রিকান ইউনিয়ন সম্মেলনে এই ইস্যুটি কূটনৈতিক কোনো বিতর্কের জন্ম দেয় কি না।