ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক সমীকরণে এখন সবচেয়ে বড় নাম তারেক রহমান। নির্বাচনী উত্তাপ শেষে দেশ যখন নতুন অধ্যায়ের অপেক্ষায়, তখন বিশ্ব গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে নিজের আগামীর লক্ষ্য ও রূপরেখা স্পষ্ট করলেন বিএনপির চেয়ারম্যান। শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর অভিজাত হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে বিদেশি সাংবাদিকদের তীক্ষ্ণ সব প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান তুলে ধরেন তার দলের ‘Foreign Policy’, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও সুশাসনের অঙ্গীকার।
কূটনৈতিক ভারসাম্য ও জাতীয় স্বার্থের অগ্রাধিকার
সংবাদ সম্মেলনে ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক অশোক রাজ বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুললে তারেক রহমান অত্যন্ত সুকৌশলী ও দৃঢ় জবাব দেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “বিএনপির পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হবে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং জনগণের স্বার্থ রক্ষা করা। আমরা সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব চাই, তবে তা অবশ্যই আমাদের জাতীয় স্বার্থকে ক্ষুণ্ণ করে নয়।”
যুক্তরাজ্যের ‘The Independent’-এর সাংবাদিক আলিশা রহমান সরকার যখন ভারত, পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষার ‘Geopolitical Balance’ নিয়ে প্রশ্ন করেন, তখন দলের অবস্থান পরিষ্কার করেন স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি জানান, বিএনপির লক্ষ্য একটি নিরপেক্ষ ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি, যেখানে কোনো নির্দিষ্ট দেশ নয়, বরং গ্লোবাল পার্টনারশিপ প্রাধান্য পাবে।
সার্ক পুনরুজ্জীবন ও আঞ্চলিক রাজনীতি
পাকিস্তানের ‘Geo News’-এর সাংবাদিক এজাজ সাইদ সার্ক (SAARC) নিয়ে তারেক রহমানের পরিকল্পনা জানতে চান। জবাবে বিএনপির চেয়ারম্যান অত্যন্ত দূরদর্শী মনোভাব প্রদর্শন করেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, সার্ক গঠনের মূল ধারণাটি এসেছিল বাংলাদেশ থেকেই। তিনি বলেন, “আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য আমরা সার্ককে পুনরায় সক্রিয় করতে চাই। সরকার গঠনের পর আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে এটি আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার হবে।”
শেখ হাসিনার বিচার এবং আওয়ামী লীগ নেত্রী টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলার বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান কোনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ইঙ্গিত না দিয়ে বরং আইনের শাসনের প্রতি গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, “যেকোনো বিচার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে স্বাধীন বিচার বিভাগ ও আইনি ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করবে। আমরা ‘Rule of Law’ বা আইনের শাসনে বিশ্বাসী।”
অর্থনৈতিক সংস্কার ও সুশাসনের চ্যালেঞ্জ
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘Al Jazeera’-এর সাংবাদিক বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নিয়ে প্রশ্ন করেন। তারেক রহমান অত্যন্ত বস্তুনিষ্ঠভাবে পাঁচটি প্রধান চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করেন: ১. ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনরায় সচল করা। ২. আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কঠোর নিয়ন্ত্রণে আনা। ৩. রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ‘Depoliticization’ বা অরাজনৈতিকীকরণ নিশ্চিত করা। ৪. সুশাসন বা ‘Good Governance’ প্রতিষ্ঠা। ৫. দুর্নীতির মূলোৎপাটন।
চীনা সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি ‘Belt and Road Initiative’ (BRI) নিয়ে বলেন, “যেকোনো আন্তর্জাতিক প্রকল্প বা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আমরা বিচার করব তা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য কতটা সহায়ক। জনগণের পকেটের টাকা যেখানে খরচ হবে, সেখানে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে।”
তরুণ প্রজন্ম ও আগামীর কর্মসংস্থান
ব্রিটিশ সংবাদপত্র ‘Financial Times’-এর প্রতিনিধির প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান তার অর্থনৈতিক দর্শনের প্রতিফলন ঘটান। তিনি বলেন, “আমাদের প্রধান লক্ষ্য হবে দেশে ‘Foreign Direct Investment’ (FDI) বৃদ্ধি করা এবং ব্যবসার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে ব্যাপক ‘Job Creation’ বা নতুন কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা।” তরুণদের গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়ে তিনি জানান, বিএনপি কেবল তরুণদের কথা শুনবে না, বরং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাদের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করবে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, তার দল সমাজ ও রাষ্ট্রের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের সমন্বিত উন্নয়নে বিশ্বাসী।
প্রায় দুই ঘণ্টা ব্যাপী চলা এই সংবাদ সম্মেলনে তারেক রহমানের আত্মবিশ্বাসী ও তথ্যনির্ভর বক্তব্য কূটনৈতিক মহলে ইতিবাচক সংকেত পাঠিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সার্চ ট্যাগ: tarek rahman, bnp, foreign policy, election 2026, bangladesh economy, saarc, india bangladesh, china bri, good governance, press conference