সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ল্যান্ডস্লাইড বা ‘ভূমিধস’ জয় পেয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (BNP)। দীর্ঘ দেড় দশক পর রাজনীতির ময়দানে দলটির এমন একক আধিপত্যের নেপথ্য কারণ কী? প্রথাগত রাজনৈতিক ভাষ্যের বাইরে গিয়ে বিষয়টি বিশ্লেষণ করেছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইনোভেশন কনসাল্টিং’। তাদের গবেষণায় উঠে এসেছে, এবার ভোটারদের মন জয়ে ‘আইডিওলজিক্যাল ক্যাম্পেইন’ (Ideological Campaign)-এর চেয়ে ‘ইকোনমিক ক্যাম্পেইন’ (Economic Campaign) বা অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতিই বেশি কার্যকর ভূমিকা পালন করেছে।
অর্থনৈতিক বনাম আদর্শিক লড়াই: এগিয়ে থাকল ‘ফ্যামিলি কার্ড’
রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বিডিবিএল ভবনে আয়োজিত এক আলোচনায় ইনোভেশন কনসাল্টিং তাদের জরিপের ফলাফল প্রকাশ করে। সংস্থাটির মতে, বিএনপির পক্ষ থেকে ঘোষিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘হেলথ কার্ড’-এর মতো সরাসরি জনকল্যাণমূলক সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি (Social Safety Net) সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এই অর্থনৈতিক নিশ্চয়তাকে বর্তমান বাজারের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে বড় ভরসা হিসেবে গ্রহণ করেছে।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর দীর্ঘদিনের পরিচিত ‘আদর্শিক প্রচার’ ভোটারদের বড় একটি অংশকে আকৃষ্ট করতে ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষ করে নারী ও তরুণ ভোটাররা (Young Voters) বিমূর্ত আদর্শের চেয়ে জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ও সরাসরি সেবাপ্রাপ্তিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। ইনোভেশন কনসাল্টিংয়ের ম্যানেজিং ডিরেক্টর রুবাইয়াত সারওয়ারের মতে, ভবিষ্যতে রাজনৈতিক দলগুলোকে কেবল জনসভা বা স্লোগানে সীমাবদ্ধ না থেকে নারী ও তরুণদের আকাঙ্ক্ষা বুঝে কর্মসূচি প্রণয়ন করতে হবে।
নির্বাচন কমিশনের অদক্ষতা ও ‘ভয়েস ফর রিফর্ম’-এর সমালোচনা
নির্বাচনকালীন ও নির্বাচন-পরবর্তী তথ্য ব্যবস্থাপনায় নির্বাচন কমিশনের (EC) ধীরগতি নিয়ে কড়া সমালোচনা করেছে নাগরিক সংগঠন ‘ভয়েস ফর রিফর্ম’। সংগঠনের প্রতিনিধি সৈয়দ হাসিব উদ্দিন হোসেন বলেন, কোন দল কত শতাংশ ভোট পেয়েছে, তা জানাতে কমিশনের এমন বিলম্ব অদক্ষতারই প্রমাণ। ডিজিটাল যুগে ডাটা ম্যানেজমেন্টে (Data Management) কমিশনের এমন স্থবিরতা স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। আলোচকরা মনে করেন, আধুনিক জরিপ পদ্ধতির মাধ্যমে জনগণের প্রকৃত আকাঙ্ক্ষা বুঝে তা রাজনৈতিক দলের কাছে পৌঁছে দেওয়া গেলে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক উত্তরণ আরও সহজ হবে।
নির্বাচনী পরিসংখ্যান ও আগামীর সরকার
নির্বাচন কমিশনের জনসংযোগ শাখা থেকে প্রাপ্ত সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি এককভাবে ৪৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ ভোট পেয়েছে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী পেয়েছে ৩১ দশমিক ৭৬ শতাংশ ভোট। ২৯৭টি আসনের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, বিএনপি এককভাবে ২০৯টি আসন পেয়ে ম্যাজিক ফিগার অতিক্রম করেছে। তাদের জোট শরিকদের ৩টি আসন মিলিয়ে বর্তমানে বিএনপি জোটের আসন সংখ্যা ২১২। এর বিপরীতে ১১-দলীয় জোট পেয়েছে ৭৭টি আসন।
ঐতিহাসিক শপথ ও ড. ইউনূসের অভিনন্দন
আগামী ১৭ ফেব্রুয়ারি (মঙ্গলবার) সকালে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পড়াবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দীন। এরপর বিকেলেই জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত হবে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ পাঠ করাবেন।
তারেক রহমানের এই ঐতিহাসিক বিজয়ে তাকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এক অভিনন্দন বার্তায় তিনি বলেন, "তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির এই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের ইতিহাসে একটি মাইলফলক। জনগণের এই সুস্পষ্ট রায় সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা (Institutional Stability) রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।