১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানজুড়ে ছড়িয়ে পড়লেও আন্দোলনের চেতনা ও তৎপরতায় পিছিয়ে ছিল না লালমনিরহাট। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত লালমনিরহাটের ছাত্রসমাজ ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব ধারাবাহিকভাবে মাতৃভাষা বাংলার দাবিতে সংগ্রাম চালিয়ে যান। মহান ভাষা আন্দোলনে জেলার ১২ জন ভাষাসৈনিক সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। তাঁদের মধ্যে বর্তমানে জীবিত আছেন একমাত্র ব্যক্তি আবদুল কাদের ভাসানী। বাকি ১১ জন ইতোমধ্যে ইন্তেকাল করেছেন। প্রয়াত ভাষাসৈনিকরা হলেন— আব্দুল কুদ্দুছ, আশরাফ আলী, ড. শাফিয়া খাতুন, মনিরুজ্জামান, কমরেড শামসুল হক, মহেন্দ্র নাথ রায়, আবিদ আলী, জরিনা বেগম, জাহানারা বেগম (দুলু), কমরেড সিরাজুল ইসলাম ও মোঃ জহির উদ্দিন আহম্মদ। ছাত্রনেতা থেকে ভাষা সংগ্রাম পরিষদের সম্পাদক ১৯৫২ সালে লালমনিরহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র থাকাকালীন আবদুল কাদের ভাসানী ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। সে সময় লালমনিরহাটে গঠিত ভাষা সংগ্রাম পরিষদের তিনি সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনার ধারাবাহিকতায় ২৩ ফেব্রুয়ারি হরতাল সমর্থনে আবদুল কাদের ভাসানী ও ভাষা সংগ্রাম পরিষদের সদস্যরা লালমনিরহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বাড়ি পাঠিয়ে দেন। বিষয়টি জানাজানি হলে লালমনিরহাট থানা পুলিশ বিদ্যালয়ে এসে তাঁদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা করে। তবে প্রধান শিক্ষক পুলিশকে বিদ্যালয়ে প্রবেশের অনুমতি না দেওয়ায় পুলিশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে ফিরে যায়। পরবর্তীতে গ্রেপ্তার এড়াতে ছাত্রনেতারা বিদ্যালয়ের পেছনের সুইপার কলোনি দিয়ে সরে যান। পরে তাঁদের চিহ্নিত করে পুলিশ বিভিন্ন সময় ধরে থানায় আটক রাখে। ক্রমাগত হয়রানির মুখে তাঁরা আত্মগোপনে থেকে আন্দোলন চালিয়ে যান। মুক্তিযুদ্ধেও সক্রিয় ভূমিকা ভাষা আন্দোলনের এই সাহসী সংগঠক ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধেও সংগঠক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। স্বাধীনতা সংগ্রামের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি সক্রিয় ছিলেন বলে জানা যায়। বর্তমানে আবদুল কাদের ভাসানী লালমনিরহাট জেলার লালমনিরহাট উপজেলার মহেন্দ্রনগর ইউনিয়নের হাড়ীভাঙ্গা (হলদীটারী) গ্রামে পরিবারসহ বসবাস করছেন। বার্ধক্যজনিত কারণে তাঁর শারীরিক অবস্থা ভালো নয়।
জেলার একমাত্র জীবিত ভাষাসৈনিক হিসেবে আবদুল কাদের ভাসানীর খোঁজ-খবর বছরজুড়ে তেমন কেউ রাখেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে লালমনিরহাট জেলা প্রশাসন মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানায় এবং ২১ ফেব্রুয়ারি সংবর্ধনা প্রদান করে। এ ছাড়া বছরের বাকি ১১ মাস তাঁর খোঁজ নেওয়ার তেমন উদ্যোগ দেখা যায় না—এমনটাই স্থানীয়দের দাবি। ভাষা আন্দোলনের এ ই জীবন্ত ইতিহাসকে যথাযথ সম্মান ও সার্বিক সহায়তা প্রদানের দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।