মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন বারুদের গন্ধে ভারী। ইরান ও তার মিত্রদের সঙ্গে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান উত্তজনা এবার নতুন ও ভয়াবহ মোড় নিয়েছে। ইরানের সাম্প্রতিক এক বিশাল পাল্টাপাল্টি সামরিক অভিযানের (Counter-offensive) ঢেউ আছড়ে পড়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতেও (UAE)। তেহরানের নজিরবিহীন এই ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় আমিরাতে কর্মরত একজন বাংলাদেশিসহ অন্তত তিনজনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
হতাহতের বিবরণ ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপি (AFP) এবং আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাতে জানা গেছে, ইরানের এই আকস্মিক হামলায় এখন পর্যন্ত তিন বিদেশি নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একজন বাংলাদেশি, একজন পাকিস্তানি এবং একজন নেপালি নাগরিক রয়েছেন। এছাড়া হামলায় অন্তত ৫৮ জন গুরুতর আহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে দেশটির স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ। আহতদের স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে জরুরি চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তবে নিহতদের বিস্তারিত পরিচয় এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
হামলার ভয়াবহতা ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সাফল্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইরান এই অভিযানে বিশাল সমরাস্ত্রের ব্যবহার করেছে। একযোগে ১৬৫টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (Ballistic Missile) আমিরাতের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ছোড়া হয়। তবে দেশটির অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (Air Defense System) অত্যন্ত তৎপরতার সাথে ১৫২টি ক্ষেপণাস্ত্র মাঝ আকাশেই ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে। এছাড়া দুটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রকেও (Cruise Missile) সফলভাবে প্রতিহত করা হয়েছে।
ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি ইরান একযোগে ৫৪১টি ড্রোন (Drone) ব্যবহার করে আক্রমণ চালিয়েছিল। আমিরাতি প্রতিরক্ষা বাহিনী জানায়, তাদের রাডারে ধরা পড়া এসব ড্রোনের মধ্যে ৫০৬টিকেই লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার আগেই ধ্বংস করা সম্ভব হয়েছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বিপুল পরিমাণ ড্রোন ও মিসাইল হামলা মোকাবিলা করা যেকোনো দেশের জন্যই একটি বড় চ্যালেঞ্জ (Operational Challenge)।
আঞ্চলিক সংঘাত ও ভূ-রাজনীতি ইরানের পক্ষ থেকে এই হামলাকে তাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষার ‘পাল্টা জবাব’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনীর সাম্প্রতিক বিভিন্ন পদক্ষেপের প্রতিবাদে ইরান তাদের সামরিক সক্ষমতার জানান দিচ্ছে। তবে সরাসরি আরব আমিরাতে এই ধরনের বড় মাপের হামলা আঞ্চলিক নিরাপত্তার সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলেছে। দুবাই এবং আবুধাবির মতো ব্যবসায়িক ও পর্যটন কেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
আতঙ্কে প্রবাসী সম্প্রদায় আমিরাতে বসবাসরত কয়েক লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি বর্তমানে এক অনিশ্চিত সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। বিশেষ করে কর্মক্ষেত্রে বা আবাসিক এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ার ঝুঁকি থাকায় সাধারণ মানুষের চলাচলে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বাংলাদেশ দূতাবাস ও কনস্যুলেটের পক্ষ থেকে প্রবাসীদের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে এবং স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকটময় পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা এখন বিশ্ব রাজনীতির প্রধান আলোচনার বিষয়। একদিকে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা প্রশমনের চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে পাল্টাপাল্টি হামলার হুমকি অঞ্চলটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের (Full-scale War) কিনারে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।