• দেশজুড়ে
  • সৈয়দপুরে আইয়ুব রাহী কাফেলার সুরে ৫০ বছর ধরে ডাক দেয় সাহরির

সৈয়দপুরে আইয়ুব রাহী কাফেলার সুরে ৫০ বছর ধরে ডাক দেয় সাহরির

দেশজুড়ে ১ মিনিট পড়া
সৈয়দপুরে আইয়ুব রাহী কাফেলার সুরে ৫০ বছর ধরে ডাক দেয় সাহরির

তৈয়ব আলী সরকার নীলফামারী।

রাতের গভীরতায় শহর যখন ঘুমের চাদরে ঢাকা। ঠিক তখনই দূর থেকে ভেসে আসে এক চেনা সুর- “রোজাদারো উঠো সেহরির ওয়াক্ত হো চুকা হ্যায়” অর্থাৎ রোজাদাররা উঠে পড়ুন, সেহরির সময় হয়ে গিয়েছে। এই সুরে ভাঙে ঘুম। মনে করিয়ে দেয় এটা রমজান মাস। রমজান মাস এলেই নীলফামারীর সৈয়দপুর শহরে গভীর রাতের নীরবতা ভেঙে অলিগলি, পাড়া-মহল্লায় ভেসে আসত কাফলার সুমধুর ধ্বনি। সেহরির সময় রোজাদারদের জাগিয়ে তুলতে ছন্দাকারে (কাসিদা) আর দরদমাখা আহ্বান ছিল এই শহরের রমজানের অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ। সে সময় কাফলার ডাক শুধু সাহরির মাধ্যম ছিল না, এ ছিল সৈয়দপুরের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য। কালের আবর্তে আধুনিক প্রযুক্তি, মোবাইল ফোনের অ্যালার্ম আর যান্ত্রিক জীবনের চাপে হারিয়ে যেতে বসেছে কাফলার সেই চিরচেনা সুর। আজ তা বিলুপ্ত প্রায় এক লোকজ ঐতিহ্য। আর এই ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছেন কয়েকজন (অবাঙ্গালি বিহারী) ধর্মভিরু মানুষ । সৈয়দপুরে যুগ যুগ ধরে সাহরির ঘণ্টা শহরের অলিগলিতে ঘুরে বেড়ায় ঘুম ভাঙ্গানোর দল যাদের বলা হয় কাফেলা। মাইকে ছন্দে ছন্দে, গজল আর ইসলামী কবিতার সুরে তারা রোজাদারদের ডেকে তোলে সাহরির জন্য। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বাঁশবাড়ি হানিফ মোড় থেকে আজমেরি কাফেলা, হাতিখানা থেকে গুলজারে মাদিনা কাফেলা, মেডিক্যাল মোড় থেকে আশরাফি কাফেলা, মিস্ত্রিপাড়া থেকে বুলান্দ কাফেলা, আমিন মোড় থেকে হুসাইনি কাফেলা, ইসলামবাগ থেকে কাদিমি কাফেলাসহ একাধিক দল শহরের বিভিন্ন প্রান্তে দায়িত্ব পালন করছে। ফজরের নামাজের আগেই সুরেলা কণ্ঠে তারা জানিয়ে দেয় সাহরির আর কত সময় বাকি। সেই ডাকে ঘুম ভাঙে শিশু থেকে বৃদ্ধদের। এই হারিয়ে যেতে বসা সংস্কৃতির মাঝেও দাঁড়িয়ে আছেন সৈয়দপুরের প্রবীণ উর্দু কবি আইয়ুব রাহি। যখন চারপাশের মানুষ যান্ত্রিকতার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে, তখন তিনি আজও আগলে রেখেছেন কাফলার সেই প্রাচীন ধারা। রাহির কাছে কাফলা কোনো পেশা নয়, এটি তাঁর বিশ্বাস ও দায়িত্ব। লোকজ এই সংস্কৃতি বাঁচিয়ে রাখার দায়বদ্ধতা থেকেই তিনি আজও মাইক হাতে নামেন রাতের অন্ধকারে। মাদিনা কাফেলার রাহি জানান, দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে এ কাজ করছি। আমার বাবা, দাদা সবাই করেছে। রাত জেগে মানুষকে সাহরির জন্য জাগানো এটা সৈয়দপুরের সংস্কৃতি, আমাদের ঐতিহ্য। তাছাড়া এটাকে আমরা ইবাদত মনে করি থাকি। আরেক আজমেরি কাফেলার প্রধান ইসলাম জানান, ১৮ বছর ধরে এ কাজ করে আসছি আমি। তবুও লোকজ সংস্কৃতি রক্ষা আর সওয়াবের নিয়তে আজও বের হয় কাফেলা নিয়ে। রাত জেগে এভাবে ডেকে তোলা তাদের কাছে পরম পূণ্যের কাজও মনে করেন তাঁরা। অনেকে আবার একে সামাজিক দায়িত্ব বলেও মনে করেন। কালের আবর্তে কাফেলার সংখ্যা কমেছে। আগে প্রায় প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় একাধিক কাফেলা থাকলেও এখন হাতে গোনা কয়েকটি দল এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। আধুনিকায়ন, মোবাইল ফোনের অ্যালার্ম সবকিছুই যেন কাফেলার জায়গা দখল করে নিয়েছে। কাফেলার সদস্যরা জানান, কেউ খুশি হয়ে দৈনিক নগদ হাতে কিছু দেন, আবার অনেকেই ঈদের আগে একবারে দিয়ে দেন। আমাদের প্রাপ্তি মানুষের দোয়া। ডিজিটাল যুগে অ্যালার্মেই সাহরি হয়। তবু কিছু মানুষ এখনো জেগে ওঠে কাফেলার সুরে (কাসিদায়)। এ যেন শুধু ঘুম ভাঙানোর স্মৃতি, সংস্কৃতি আর রমজানের আবেগকে জাগিয়ে তোলা।