মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে এবার যুক্ত হলো নতুন সমীকরণ। মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি নিহত হওয়ার পর তেহরানের প্রতিশোধের আগুন এবার প্রতিবেশী দেশ তুরস্কের দোরগোড়ায় পৌঁছেছে। বুধবার (৪ মার্চ) এক নজিরবিহীন ঘটনায় ইরান থেকে উৎক্ষেপিত একটি শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (Ballistic Missile) তুরস্কের আকাশসীমায় প্রবেশের পর তা ধ্বংস করেছে ন্যাটোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা ও রয়টার্স এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছে।
আকাশপথের রুদ্ধশ্বাস লড়াই ও প্রতিরক্ষা বলয়
তুরস্কের জাতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের (Ministry of National Defense) দেওয়া তথ্যমতে, ইরান থেকে ছোড়া ওই ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রথমে ইরাক ও সিরিয়ার আকাশসীমা অতিক্রম করে। এরপর সেটি তুরস্কের সার্বভৌম আকাশসীমায় প্রবেশ করলে রেডারে ধরা পড়ে। পূর্ব ভূমধ্যসাগরে মোতায়েন করা ন্যাটোর (NATO) অত্যাধুনিক বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলো তাৎক্ষণিকভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্যে আঘাত হানার আগেই ক্ষেপণাস্ত্রটি মাঝ আকাশে ধ্বংস করে দেয়।
তবে ওই ক্ষেপণাস্ত্রটির সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু তুরস্কের ভেতরে কোনো সামরিক ঘাঁটি ছিল নাকি অন্য কিছু, তা নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা কাটেনি। এই হামলার বিষয়ে ইরান সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
আঙ্কারার কড়া হুঁশিয়ারি ও কূটনৈতিক সংঘাত
ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনার পরপরই তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক কড়া বিবৃতিতে জানিয়েছে, সংঘাত বৃদ্ধি পায় এমন যেকোনো কর্মকাণ্ড থেকে সব পক্ষকে বিরত থাকতে হবে। বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ‘আঙ্কারা তার ভূখণ্ড এবং সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে যেকোনো প্রতিকূল পদক্ষেপের সমুচিত জবাব দেওয়ার অধিকার সংরক্ষণ করে।’
এদিকে ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় কূটনৈতিক স্তরেও শুরু হয়েছে তীব্র বাদানুবাদ। রয়টার্স জানিয়েছে, তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিকে জরুরি ফোন করে এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। ফোনালাপের সময় ফিদান অত্যন্ত কড়া ভাষায় জানান যে, এ ধরনের উসকানিমূলক পদক্ষেপ আঞ্চলিক পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যেতে পারে। তিনি ইরানকে সরাসরি সতর্ক করে বলেন, সংঘাত আরও বিস্তৃত করতে পারে এমন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা থেকে তেহরানকে বিরত থাকতে হবে।
আঞ্চলিক অস্থিরতা ও ন্যাটোর ভূমিকা
আয়াতুল্লাহ খামেনির মৃত্যুর পর ইরান সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো এবং তেহরান সরাসরি মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে লক্ষ্য করে একের পর এক হামলা চালাচ্ছে। তবে ন্যাটোর সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে তুরস্কের আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র পাঠানোর ঘটনাটি এই সংকটে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যদি কোনোভাবে ন্যাটোর বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (Air Defense System) ব্যর্থ হতো এবং ক্ষেপণাস্ত্রটি তুরস্কের মাটিতে আঘাত হানত, তবে তা ‘আর্টিকেল ৫’ অনুযায়ী তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি করতে পারত।
বর্তমানে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে এক ধরনের অস্থির ‘পাওয়ার ভ্যাকুয়াম’ তৈরি হয়েছে। খামেনি পরবর্তী সময়ে ইরানের সামরিক নেতৃত্বের এই বেপরোয়া মনোভাব তুরস্কের মতো আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে তেহরানের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক সম্পর্কে বড় ধরনের ফাটল ধরাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।