ইরান ও ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান সামরিক সংঘাত এখন এক নতুন এবং আরও ভয়াবহ মোড় নিতে যাচ্ছে। ইসরাইলি সামরিক অভিযানের সঙ্গে সরাসরি পরিচিত দুটি বিশ্বস্ত সূত্রের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, এই যুদ্ধ এখন ‘দ্বিতীয় পর্যায়ে’ (Second Phase) প্রবেশ করতে শুরু করেছে। এই ধাপে ইসরাইলি বিমান বাহিনীর মূল লক্ষ্যবস্তু হতে যাচ্ছে ইরানের মাটির গভীরে সুসংরক্ষিত ও চাপা পড়ে থাকা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (Ballistic Missile) স্থাপনাগুলো।
গত ৫ মার্চ তেহরানের আকাশে দফায় দফায় বিস্ফোরণ ও ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যাওয়ার পর থেকেই জল্পনা বাড়ছিল যে, ইসরাইল এবার তাদের রণকৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে।
সারফেস লঞ্চার থেকে ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার: কৌশলী পরিবর্তন
ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (IDF) দাবি অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম কয়েক দিনে তারা ইরানের ভূপৃষ্ঠে থাকা শত শত ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপক (Launcher) ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে, যা ইসরাইলি শহরগুলোকে লক্ষ্য করে মোতায়েন করা হয়েছিল। তবে দ্বিতীয় পর্যায়ের অভিযানে ইসরাইল এবার তাদের অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে মাটির গভীরের বাঙ্কার (Bunker) এবং গোপন গুদামগুলোতে আঘাত হানবে। এসব স্থাপনায় ইরান তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং উন্নত প্রযুক্তির সামরিক সরঞ্জাম মজুত করে রেখেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি সূত্র জানিয়েছে, ইসরাইলের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো যুদ্ধের সমাপ্তি নাগাদ ইরানের আকাশপথে হামলা চালানোর ক্ষমতাকে পুরোপুরি পঙ্গু করে দেয়া এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শীর্ষ নেতৃত্বকে নির্মূল করা।
আকাশসীমার নিয়ন্ত্রণ ও গোয়েন্দা তৎপরতা
ইসরাইল ও মার্কিন সামরিক বাহিনী যৌথভাবে দাবি করেছে যে, হামলার শুরুর কয়েক দিনের মধ্যেই তারা ইরানের আকাশসীমার (Airspace) সিংহভাগ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হয়েছে। এর ফলে ইরানের ভেতরে যেকোনো লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে আঘাত হানা বা প্রিসিশন স্ট্রাইক (Precision Strike) চালানো তাদের জন্য সহজ হয়ে পড়েছে।
বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে ইসরাইলি বাহিনী জানায়, গত রাতে তারা ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত একটি সুবিস্তৃত ভূগর্ভস্থ অবকাঠামো এবং বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র মজুত কেন্দ্রে সফলভাবে আঘাত হেনেছে। উল্লেখ্য যে, গত শনিবার যৌথ হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে এই প্রথম ইসরাইল আনুষ্ঠানিকভাবে ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনায় হামলার কথা স্বীকার করল।
ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার ও আঞ্চলিক সমীকরণ
ইরানের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে। ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে, যুদ্ধের আগে ইরানের হাতে প্রায় ২,৫০০টি শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র ছিল। তবে অনেক সামরিক বিশ্লেষকের দাবি, এই সংখ্যা ৬,০০০-এরও বেশি হতে পারে। এই বিশাল মজুত ধ্বংস করা ইসরাইলের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ, কারণ ইরানের অনেক ‘মিসাইল সিটি’ (Missile Cities) পাহাড়ি অঞ্চলের গভীর সুড়ঙ্গে অবস্থিত।
এদিকে, রিপাবলিকানদের বাধার কারণে ইরানে মার্কিন হামলা বন্ধের প্রস্তাব ঝুলে যাওয়ায় সংঘাত আরও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে, মধ্যস্থতার জন্য চীন বিশেষ দূত পাঠানোর কথা বললেও রণক্ষেত্রের উত্তাপ তাতে বিন্দুমাত্র কমেনি। সমরবিদদের মতে, দ্বিতীয় পর্যায়ের এই ‘আন্ডারগ্রাউন্ড ওয়ারফেয়ার’ (Underground Warfare) সফল হলে মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ভারসাম্য চিরতরে বদলে যেতে পারে।