মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে বইছে উত্তাল হাওয়া। ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযান নিয়ে এবার সুর পাল্টেছে পারস্য উপসাগরীয় আরব দেশগুলো। তেহরানের ওপর মার্কিন নেতৃত্বাধীন হামলা এখনই বন্ধ না করে তা চালিয়ে যাওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে গোপন বার্তা পাঠিয়েছে ওই অঞ্চলের প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলো। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে বুধবার (১৭ মার্চ) এই তথ্য জানানো হয়েছে।
ভবিষ্যৎ বিপদের আশঙ্কায় সতর্ক অবস্থান
আঞ্চলিক তিনটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, আরব দেশগুলোর মধ্যে এক ধরনের গভীর ভীতি কাজ করছে। তাদের আশঙ্কা, যদি এই মুহূর্তে হামলা থামিয়ে দেওয়া হয়, তবে চলমান যুদ্ধ শেষে ইরান আরও শক্তিশালী ও অপ্রতিরোধ্য হয়ে আবির্ভূত হতে পারে। এই সম্ভাবনাকে তারা নিজেদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে। বিশেষ করে, ইরান যদি তার সামরিক সক্ষমতা পুনরায় গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ পায়, তবে ভবিষ্যতে ওই অঞ্চলের দেশগুলোর ‘Oil Industry’ বা তেল শিল্পের ওপর ভয়াবহ হামলার ঝুঁকি বেড়ে যাবে।
ইরানকে দুর্বল করার কৌশলগত চাপ
তিনটি আঞ্চলিক সূত্র এবং যুক্তরাষ্ট্র ও আরবের পাঁচজন কূটনীতিক রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন বর্তমানে আরব দেশগুলোকে সরাসরি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নিতে চাপ দিচ্ছে। তবে আরব দেশগুলোর কৌশল ভিন্ন। তাদের মতে, সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর চেয়ে যুক্তরাষ্ট্র যেন তার অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র দিয়ে ইরানের ‘Military Capability’ বা সামরিক সক্ষমতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল করে দেয়। তাদের দাবি, ইরানকে এমনভাবে আঘাত করতে হবে যেন তারা নিকট ভবিষ্যতে বড় ধরনের কোনো পাল্টাহামলা চালানোর শক্তি হারিয়ে ফেলে। অন্যথায়, তেহরানের ছায়া বাহিনীর (Proxy Groups) মাধ্যমে আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা ও তেল অবকাঠামো ধ্বংসের ঝুঁকি থেকেই যাবে।
তেল সম্পদ ও বৈশ্বিক অর্থনীতির নিরাপত্তা
পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো মূলত তাদের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড অর্থাৎ জ্বালানি তেলের খনি ও শোধনাগারগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে চরম উদ্বিগ্ন। অতীতে সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনাগুলো তাদের এই উদ্বেগকে আরও উস্কে দিয়েছে। আরব নেতাদের বদ্ধমূল ধারণা, ইরান যদি এই যুদ্ধের পর আঞ্চলিক শক্তিতে (Regional Power) পরিণত হয়, তবে জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতা নষ্ট করা তাদের জন্য সহজ হবে। তাই তারা চায়, যুক্তরাষ্ট্র যেন এই সুযোগে ইরানের শক্ত ঘাঁটিগুলো পুরোপুরি নির্মূল করে দেয়।
কূটনৈতিক টানাপড়েন ও যুদ্ধের ভবিষ্যৎ
যদিও প্রকাশ্যে অনেক আরব দেশ শান্তি ও স্থিতিশীলতার কথা বলছে, কিন্তু পর্দার আড়ালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের এই ‘Strategic’ আলোচনা যুদ্ধের মোড় ভিন্ন দিকে ঘুরিয়ে দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত এই বার্তার বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই ‘Geopolitical’ খেলায় আরব দেশগুলোর সমর্থন ধরে রাখতে ওয়াশিংটনকে এখন অত্যন্ত সংবেদনশীল সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
ইরানের পক্ষ থেকেও কড়া হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে যে, তাদের ওপর হামলা অব্যাহত থাকলে তার পরিণাম হবে ভয়াবহ। সব মিলিয়ে, পারস্য উপসাগর জুড়ে এখন এক চরম অনিশ্চয়তা ও বৃহৎ যুদ্ধের কালো মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে।