বর্তমান যুগে অনিয়মিত জীবনযাপন এবং খাদ্যাভ্যাসের কারণে 'কিডনি স্টোন' (Kidney Stone) বা বৃক্কে পাথর হওয়ার সমস্যা এক ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এটি কেবল শরীরবৃত্তীয় জটিলতাই নয়, বরং অসহ্য ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। চিকিৎসকদের মতে, কিডনিতে খনিজ এবং লবণ জমা হয়ে শক্ত স্ফটিকে পরিণত হলে তাকে পাথর বলা হয়। তবে আশার কথা হলো, সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং নির্দিষ্ট কিছু ফল নিয়মিত গ্রহণের মাধ্যমে এই ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।
প্রাকৃতিক ‘প্রতিরক্ষামূলক ঢাল’ যখন ফল সম্প্রতি ‘ক্লিনিক্যাল জার্নাল অফ দ্য আমেরিকান সোসাইটি অফ নেফ্রোলজি’ (CJASN)-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, কিছু বিশেষ ফল কিডনি স্টোনের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক সুরক্ষা কবচ বা ‘প্রটেক্টিভ শিল্ড’ হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে সাইট্রাস জাতীয় ফল এবং উচ্চ জলীয় উপাদান সমৃদ্ধ ফলগুলো প্রস্রাবে পাথরের উপাদান জমাট বাঁধতে বাধা দেয়।
সাইট্রাস ফলের জাদুকরী ভূমিকা লেবু, কমলা, মাল্টা এবং জাম্বুরার মতো সাইট্রাস ফ্রুটস (Citrus Fruits) কিডনির স্বাস্থ্যের জন্য মহৌষধ। এই ফলগুলোতে প্রচুর পরিমাণে প্রাকৃতিক ‘সাইট্রেট’ (Citrate) নামক একটি যৌগ থাকে। এই সাইট্রেট প্রস্রাবের অম্লতা নিয়ন্ত্রণ করে এবং ক্যালসিয়ামকে অন্য খনিজ পদার্থের সঙ্গে যুক্ত হতে বাধা দেয়। ফলে কিডনিতে পাথর তৈরির প্রাথমিক ধাপ অর্থাৎ স্ফটিক বা ক্রিস্টাল (Crystals) গঠিত হতে পারে না।
অক্সালেট নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ফল কিডনিতে পাথর হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো ‘ক্যালসিয়াম অক্সালেট’ (Calcium Oxalate)। আপেল, নাশপাতি, পেঁপে এবং কলার মতো ফলে অক্সালেটের পরিমাণ অত্যন্ত কম থাকে। এছাড়া এই ফলগুলো পটাশিয়াম সমৃদ্ধ হওয়ায় শরীর থেকে অতিরিক্ত সোডিয়াম বের করে দিতে সাহায্য করে, যা কিডনির কর্মক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক।
তরমুজের বিশেষ অবদান কিডনি স্টোন প্রতিরোধের প্রধান শর্ত হলো শরীরকে হাইড্রেটেড রাখা। তরমুজের মতো জলীয় ফল প্রস্রাবকে পাতলা রাখতে সাহায্য করে। এতে থাকা লাইকোপেন এবং উচ্চ জলীয় উপাদান প্রস্রাবের ঘনত্ব কমিয়ে দেয়, ফলে খনিজ পদার্থগুলো কিডনির দেয়ালে থিতু হওয়ার সুযোগ পায় না।
কিভাবে কাজ করে এই প্রক্রিয়া? পুষ্টিবিদদের মতে, সাইট্রেট সমৃদ্ধ ফলগুলো ক্যালসিয়ামের সঙ্গে একীভূত হয়ে এক ধরনের রাসায়নিক বন্ধন তৈরি করে। এর ফলে ক্যালসিয়াম আর অক্সালেটের (Oxalate) সঙ্গে মিশে পাথর তৈরি করতে পারে না। সহজ কথায়, এই ফলগুলো কিডনির ভেতরে এক ধরনের প্রাকৃতিক ফিল্টার হিসেবে কাজ করে।
সতর্কতা ও পরামর্শ কিডনিতে পাথরের ঝুঁকি কমাতে কেবল ফলের ওপর নির্ভর না করে পর্যাপ্ত পানি পান এবং লবণের ব্যবহার কমানোর পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। তবে যাদের ইতিমধ্যেই বড় ধরনের স্টোন রয়েছে বা দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ (CKD) আছে, তাদের জন্য পটাশিয়াম সমৃদ্ধ ফল গ্রহণের আগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
সঠিক সময়ে খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এবং মৌসুমি ফলের সঠিক ব্যবহার আপনাকে কিডনি স্টোনের মতো যন্ত্রণাদায়ক ব্যাধি থেকে মুক্ত রাখতে পারে।