মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে (Geopolitics) এক নাটকীয় মোড় নিয়ে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তেহরানের ওপর ইসরাইল ও মার্কিন আগ্রাসনের তৃতীয় সপ্তাহে যখন সংঘাত চরম আকার ধারণ করেছে, ঠিক তখনই ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে আসা আলোচনার প্রস্তাবকে ‘প্রহসন’ বলে উড়িয়ে দিলেন তিনি। আজ মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স ইরানের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বরাতে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছে।
‘নতজানু’ না হওয়া পর্যন্ত কোনো কূটনীতি নয় নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই ইরানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের দুটি মধ্যস্থতাকারী দেশের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি গোপন বার্তা পাঠায়। যেখানে উত্তেজনা কমিয়ে আনা এবং যুদ্ধবিরতির (Ceasefire) জন্য কূটনৈতিক আলোচনার (Diplomacy) প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে মোজতবা খামেনি দায়িত্ব গ্রহণের পর তার প্রথম বিদেশ নীতি বিষয়ক বৈঠকেই অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তার সাফ কথা, "যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যতক্ষণ না পরাজয় স্বীকার করছে, নতি স্বীকার করছে এবং যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি পূরণ করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো আলোচনার টেবিল সাজানো হবে না।"
রণক্ষেত্রে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ইরানের ওপর চলমান যৌথ আগ্রাসনের ফলে পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। সরকারি হিসেবে, গত তিন সপ্তাহে ইরানে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৪৪ জনে, এবং আহত হয়েছেন ১৮ হাজারেরও বেশি মানুষ। অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও আকাশচুম্বী। তবে নতি স্বীকারের বদলে ইরান পাল্টা আঘাতের পথ বেছে নিয়েছে। শুধু ইসরাইল নয়, প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোতেও ড্রোন ও মিসাইল হামলা অব্যাহত রেখেছে তেহরান।
হরমুজ প্রণালী ও বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট যুদ্ধের প্রভাব এখন কেবল মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড়সড় আঘাত হানছে। ইরান ইতোমধ্যে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল সরবরাহ পথ ‘হরমুজ প্রণালী’ (Strait of Hormuz) বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম নিয়ে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন (Global Supply Chain) বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় তটস্থ পশ্চিমা বিশ্ব। ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে এর আগেও কূটনৈতিক আলোচনার চেষ্টা করা হয়েছিল, যা একই ধাচে প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান।
নিরাপত্তা প্রধান ও কমান্ডারের মৃত্যুর দাবি এদিকে যুদ্ধক্ষেত্রে ইসরাইল এক বড় সাফল্যের দাবি করেছে। ইসরাইলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রী কাৎজ আজ দাবি করেছেন যে, তাদের নিখুঁত বিমান হামলায় ইরানের নিরাপত্তা প্রধান আলি লারিজানি এবং বাসিজ বাহিনীর কমান্ডার গোলামরেজা সোলেইমানি নিহত হয়েছেন। এই হত্যাকাণ্ড যদি সত্য হয়, তবে তা ইরানের সামরিক কমান্ডের জন্য বড় ধাক্কা হতে পারে। তবে তেহরান এখন পর্যন্ত এই দুই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত বা অস্বীকার কোনোটিই করেনি।
ছড়িয়ে পড়ছে আগুনের লেলিহান শিখা ইরানের পাশাপাশি ইসরাইল এখন লেবাননের রাজধানী বৈরুতেও নির্বিচারে হামলা চালাচ্ছে। অন্যদিকে, ইরানের মিসাইল ও ড্রোন কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কুয়েতের আকাশসীমায় প্রবেশ করায় পুরো অঞ্চলে এক ভয়াবহ যুদ্ধের মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মোজতবা খামেনির এই অনমনীয় মনোভাব মধ্যপ্রাচ্যকে এক দীর্ঘস্থায়ী ও পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের (Full-scale War) দিকে ঠেলে দিতে পারে।