পবিত্র রমজান মাসে সিয়াম সাধনার পাশাপাশি অনেক রোজাদারের জন্যই প্রধান বিড়ম্বনা হয়ে দাঁড়ায় গ্যাস্ট্রিক বা অ্যাসিডিটির (Acidity) সমস্যা। বিশেষ করে সেহরির পরপরই বুক জ্বালাপোড়া, টক ঢেঁকুর কিংবা পেটে অস্বস্তি শুরু হলে সারাদিনের রোজা রাখা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। চিকিৎসকদের মতে, সেহরির খাবারের ধরন এবং খাওয়ার ঠিক পরেই কিছু ভুল অভ্যাসের কারণে পাকস্থলীতে অ্যাসিডের ভারসাম্য নষ্ট হয়। রোজা রাখা অবস্থায় সরাসরি কোনো ওষুধ সেবন করা সম্ভব না হলেও, কিছু নিয়ম মেনে চললে এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
সেহরির পর অস্বস্তি কমাতে তাৎক্ষণিক করণীয়
সেহরির খাবার শেষ করেই বিছানায় গা এলিয়ে দেওয়ার অভ্যাস অনেকেরই আছে। এটি ‘অ্যাসিড রিফ্লাক্স’ (Acid Reflux)-এর প্রধান কারণ। খাবার গ্রহণের পর পাকস্থলী থেকে অ্যাসিড উপরের দিকে উঠে আসে, যা বুক জ্বালাপোড়া বাড়ায়। তাই সেহরি খাওয়ার পর অন্তত ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট সোজা হয়ে বসে থাকুন। সম্ভব হলে ঘরের ভেতরেই ৫ থেকে ১০ মিনিট খুব ধীরগতিতে পায়চারি করুন। এই হালকা নড়াচড়া আপনার বিপাক প্রক্রিয়া বা ‘Metabolism’ ত্বরান্বিত করতে এবং গ্যাস কমাতে সাহায্য করবে।
পোশাক ও শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম
পেটে বা কোমরে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে এমন আঁটসাঁট পোশাক পরিধান করা থেকে বিরত থাকুন। টাইট পোশাক পাকস্থলীতে বাড়তি চাপ দেয়, যা থেকে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা প্রকট হতে পারে। এছাড়া যদি পেটে খুব বেশি অস্বস্তি বোধ হয়, তবে শান্ত হয়ে বসে দীর্ঘ শ্বাস বা ‘Deep Breathing’ ব্যায়াম করতে পারেন। এটি স্নায়ুতন্ত্রকে শিথিল করে এবং পাকস্থলীর অস্থিরতা কমাতে পরোক্ষভাবে সহায়তা করে।
আগামীর জন্য সতর্কতা: সেহরিতে যা এড়িয়ে চলবেন
সেহরির সময় কিছু মুখরোচক কিন্তু অস্বাস্থ্যকর খাবার বর্জন করা জরুরি:
১. ভাজাপোড়া ও তৈলাক্ত খাবার: পেঁয়াজু, পরোটা বা ডুবো তেলে ভাজা যেকোনো খাবার পাকস্থলীর জন্য গুরুপাক। ২. অতিরিক্ত মসলা ও ঝাল: অতিরিক্ত শুকনো মরিচ বা গরম মসলা পাকস্থলীতে প্রদাহ সৃষ্টি করে। ৩. ক্যাফেইনযুক্ত পানীয়: সেহরিতে বেশি চা বা কফি পান করলে শরীরে পানিশূন্যতা বা ‘Dehydration’ তৈরি হতে পারে, যা অ্যাসিডিটি বাড়িয়ে দেয়। ৪. কার্বোনেটেড ড্রিংকস: সফট ড্রিংকস বা কোমল পানীয় পাকস্থলীতে গ্যাসের বুদবুদ সৃষ্টি করে পেট ফাঁপা বা ‘Bloating’ তৈরি করে।
আদর্শ সেহরি: যেসব খাবার পাকস্থলী ঠান্ডা রাখবে
সারাদিন সুস্থ থাকতে সেহরির খাদ্যতালিকায় সহজপাচ্য খাবার রাখা উচিত। ভাতের পাশাপাশি ওটস (Oats), ডাল এবং প্রচুর পরিমাণে তাজা সবজি রাখা ভালো। বিশেষ করে টক দই বা মিষ্টি দই প্রাকৃতিক প্রোবায়োটিক (Probiotic) হিসেবে কাজ করে, যা হজম প্রক্রিয়াকে মসৃণ রাখে। একটি কলা বা একটি সেদ্ধ ডিম দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে এবং পাকস্থলী শান্ত রাখতে অত্যন্ত কার্যকর।
সবশেষে, ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত সময়টাতে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান নিশ্চিত করুন। শরীরে পানির ভারসাম্য ঠিক থাকলে কোষ্ঠকাঠিন্য ও গ্যাসের সমস্যা অনেকাংশেই কমে আসে। মনে রাখবেন, সঠিক খাদ্যাভ্যাসই পারে আপনার সিয়াম সাধনাকে আরামদায়ক ও প্রাণবন্ত রাখতে।