পবিত্র ঈদুল ফিতরের আনন্দ ভাগাভাগি করতে নাড়ির টানে বাড়ি ফিরছে মানুষ। কিন্তু এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে রাজধানীর প্রধান বাস টার্মিনালগুলোতে শুরু হয়েছে চরম ‘পরিবহন নৈরাজ্য’। বিশেষ করে সায়েদাবাদ ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় দূরপাল্লার বাসগুলোতে যাত্রীদের কাছ থেকে দ্বিগুণ পর্যন্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। অধিক মুনাফার লোভে অনেক বাস চালক ও মালিক নির্ধারিত রুট পরিবর্তন করে অন্য রুটে গাড়ি চালাচ্ছেন, যার ফলে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরা।
রুট বদলের ‘মহোৎসব’: নিয়মনীতির তোয়াক্কা নেই শুক্রবার (২০ মার্চ) সরেজমিনে যাত্রাবাড়ী ও সায়েদাবাদ এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অনেক লোকাল বাস এবং স্বল্প দূরত্বের দূরপাল্লার বাসগুলো তাদের নির্ধারিত রুট (Route Permit) উপেক্ষা করে দীর্ঘ পথের যাত্রী নিচ্ছে। এর প্রধান কারণ—বেশি ভাড়া। শরীয়তপুরগামী ‘বাহাদুর শাহ’ পরিবহনের যাত্রী রফিকুল ইসলাম জানান, “স্বাভাবিক সময়ে যাত্রাবাড়ী থেকে শরীয়তপুর যেতে ভাড়া লাগে ২৫০ টাকা। আজ দিতে হচ্ছে ৫০০ টাকা। তাও বাসের সামনের সিট পাওয়া যাচ্ছে না।”
অভিযোগ উঠেছে, শরীয়তপুরগামী অনেক বাস এখন বরিশাল বা খুলনার ‘খেপ’ মারছে। ‘শরীয়তপুর সুপার সার্ভিস’ নামক একটি পরিবহনের হেল্পার সরাসরি স্বীকার করেন, তারা এখন বরিশালের যাত্রী নিচ্ছেন ৯০০ টাকা করে। তার দাবি, “শরীয়তপুরে গেলে লাভ কম, তাই বরিশালের ট্রিপ দিচ্ছি।” এই রুট পরিবর্তনের কারণে নিয়মিত যাত্রীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও গন্তব্যের বাস খুঁজে পাচ্ছেন না।
ভাড়ার তালিকায় আগুন: ৫০০ টাকার টিকিট ৮০০ যাত্রীদের পকেট কাটতে কোনো রাখঢাক নেই কাউন্টারগুলোতে। বরিশালগামী ‘যমুনা লাইন’ পরিবহনের যাত্রীরা অভিযোগ করেন, নিয়মিত ৫০০ টাকার ভাড়া এখন ৮০০ টাকা রাখা হচ্ছে। এ বিষয়ে কাউন্টার কর্মী ইউসুফের দাবি, তাদের বরিশালের বাস নেই, তাই কুয়াকাটার বাসে যাত্রী তুলছেন এবং কুয়াকাটার ভাড়াই নিচ্ছেন। একইভাবে খুলনাগামী ‘তৌফিকুল–মিঠুন’ পরিবহনের বাসে ৬০০ টাকার ভাড়া ৮০০ টাকা নেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। পরিবার নিয়ে যাতায়াত করা যাত্রীরা বলছেন, অতিরিক্ত টাকা দিয়েও বাসে আরামদায়ক সিট (Seat Quality) মিলছে না।
সরকারি তদারকি বনাম মাঠের বাস্তবতা সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় থেকে দাবি করা হয়েছে যে, ভাড়া নিয়ন্ত্রণ ও ‘Passenger Harassment’ বা যাত্রী হয়রানি বন্ধে দেশজুড়ে ‘Mobile Court’ বা ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান জোরদার করা হয়েছে। এমনকি অতিরিক্ত ভাড়া ফেরত দেওয়ার দাবিও করা হয়েছে সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে। তবে শুক্রবার সকাল থেকে সায়েদাবাদ ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় যাত্রীদের ক্ষোভ ছিল ভিন্ন। ভুক্তভোগীদের দাবি, টার্মিনালগুলোতে প্রশাসনের কোনো সক্রিয় উপস্থিতি বা ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান তাদের চোখে পড়েনি। অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে টিকিট কাটার পরও কেউ তাদের অর্থ ফেরত পায়নি।
রাজধানীর ভেতরেও বাড়তি ভাড়ার চাপ দূরপাল্লার বাসের পাশাপাশি রাজধানীর অভ্যন্তরীণ ‘Public Transport’ বা গণপরিবহনেও ভাড়ার নৈরাজ্য ছড়িয়ে পড়েছে। নিয়মিত ৫০ টাকার দূরত্বে এখন ৬০-৭০ টাকা দাবি করা হচ্ছে। সিএনজি অটোরিকশা এবং রিকশার ভাড়াও সাধারণ সময়ের চেয়ে দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। লোকাল বাসের সংখ্যা রাস্তায় কমে যাওয়ায় ঘরমুখো মানুষ নিরুপায় হয়ে বেশি টাকা গুনতে বাধ্য হচ্ছেন।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঈদ মৌসুমে পরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে শুধুমাত্র জরিমানা নয়, বরং ‘Transport Syndicate’ বা সিন্ডিকেট ভাঙার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রয়োজন। অন্যথায় প্রতি বছরই সাধারণ মানুষকে উৎসবের সময় এমন নির্মম হয়রানির শিকার হতে হবে।