ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়লাভের পর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিলেও নিজের ঘরের ‘চালচিত্র’ নিয়ে কিছুটা অস্বস্তিতে রয়েছে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দীর্ঘ ১৭ বছর রাজপথের লড়াই-সংগ্রামের পর ক্ষমতায় ফিরলেও দলের প্রধান শক্তি হিসেবে পরিচিত অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোতে দেখা দিয়েছে চরম সাংগঠনিক স্থবিরতা। বর্তমান পরিসংখ্যান বলছে, বিএনপির ১১টি সহযোগী সংগঠনের মধ্যে ১০টিরই মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে অনেক আগে। এমনকি কোনো কোনো কমিটির বয়স এক যুগ ছাড়িয়ে গেছে। এই মরাকাষ্ঠে প্রাণ সঞ্চার করতে এবং নতুন ‘Leadership’ বা নেতৃত্ব তৈরিতে পবিত্র ঈদুল ফিতরের পরপরই বড় ধরনের পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় হাত দিচ্ছে দলটি।
তারেক রহমানের কড়া বার্তা: শুরু হচ্ছে ‘অপারেশন ছাত্রদল’
দলীয় সূত্রমতে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাঁর তেজগাঁও কার্যালয়ে রাজনৈতিক উপদেষ্টাদের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসেন। ওই বৈঠকে উপদেষ্টারা সংগঠনের নাজুক পরিস্থিতির ফিরিস্তি তুলে ধরলে তারেক রহমান অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিষয়টি আমলে নেন। সিদ্ধান্ত হয়, ঈদুল ফিতরের পর সবার আগে ছাত্রদলের নতুন কমিটি ঘোষণার মাধ্যমে এই ‘Restructuring’ বা পুনর্গঠন মিশন শুরু হবে। মূলত ছাত্রদলকে পুনরায় রাজপথের ‘Vanguard’ বা অগ্রসেনানী হিসেবে দেখতে চান দলীয় প্রধান।
মেয়াদোত্তীর্ণের ভিড়ে দিশেহারা তৃণমূল কর্মীরা
বিএনপির প্রায় সব অঙ্গসংগঠনের কোনো লিখিত গঠনতন্ত্র বা ‘Charter’ নেই বললেই চলে। নিয়ম অনুযায়ী প্রতি ৩ বছর পর কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও এক যুগ ধরে কোনো নির্বাচন হয়নি অনেক সংগঠনে। ফলে পদপ্রত্যাশীদের মধ্যে চরম হতাশা ও ‘Internal Conflict’ বা অভ্যন্তরীণ কোন্দল মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে।
১. ছাত্রদল: ২০২৪ সালের ১ মার্চ গঠিত বর্তমান কমিটির মেয়াদ ইতিমধ্যে শেষ। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদের জন্য বর্তমানে অন্তত এক ডজন নেতা লবিং শুরু করেছেন। তবে অভিযোগ উঠেছে, দলের ভেতরে একটি শক্তিশালী ‘Syndicate’ নিজেদের অনুসারীদের বসাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। ২. স্বেচ্ছাসেবক দল: ২০২২ সালে গঠিত এই কমিটির মেয়াদও শেষ। মজার বিষয় হলো, সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক দুজনেই এখন সংসদ সদস্য, এমনকি সাধারণ সম্পাদক রাজীব আহসান নতুন সরকারের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করছেন। ফলে সংগঠনের কাজে সময় দেওয়া তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। ৩. যুবদল: দেড় বছর পার হলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে পারেনি যুবদল। মাত্র ৬ সদস্যের আংশিক কমিটি দিয়ে চলছে এক সময়ের এই শক্তিশালী সংগঠনটি। ৪. মহিলা দল ও শ্রমিক দল: মহিলা দলের বর্তমান কমিটির বয়স ১০ বছর আর শ্রমিক দলের বয়স এক যুগ। দীর্ঘদিন কাউন্সিল না হওয়ায় এই সংগঠনগুলো কার্যত ‘অকার্যকর’ হয়ে পড়েছে। ৫ আগস্টের পর শ্রমিক দলের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন স্থানে ‘Extortion’ বা চাঁদাবাজির গুরুতর অভিযোগ ওঠায় ইমেজ সংকটে পড়েছে দলটি।
স্থবিরতা কাটাতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ‘অগ্নিপরীক্ষা’ মনে করছে নীতিনির্ধারকরা
বিএনপির নীতিনির্ধারকদের মতে, নিকট ভবিষ্যতে জাতীয় রাজনীতির কোনো বড় চ্যালেঞ্জ না থাকলেও আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন বা ‘Local Government Election’ হবে দলের জন্য বড় পরীক্ষা। মেয়াদোত্তীর্ণ ও স্থবির কমিটি নিয়ে এই নির্বাচনে লড়লে প্রত্যাশিত ফলাফল পাওয়া কঠিন হতে পারে। তাই সংগঠনের নেতৃত্ব থেকে অযোগ্য ও নিষ্ক্রিয়দের সরিয়ে ‘Dynamic’ বা গতিশীল নেতৃত্ব আনা এখন সময়ের দাবি।
দলের একজন ভাইস চেয়ারম্যান নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের বিপর্যয় দেখে আমরা শিক্ষা নিয়েছি। শক্তিশালী সংগঠন না থাকলে সুসময়েও যেকোনো বিপর্যয় ঘটতে পারে। তাই আমাদের ‘Organizational Base’ মজবুত করা অত্যন্ত জরুরি।”
মূল দলের কাউন্সিল কবে?
অঙ্গসংগঠন নিয়ে তোড়জোড় চললেও বিএনপির মূল দলের জাতীয় কাউন্সিল নিয়ে আপাতত কোনো সুখবর নেই। ২০১৬ সালের পর আর কোনো কাউন্সিল হয়নি। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি ৩ বছর পর কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও এখন লক্ষ্য কেবল সরকার পরিচালনার দিকে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন স্পষ্ট জানিয়েছেন, “এখনই দলের কাউন্সিল নিয়ে কোনো ভাবনা নেই। সবার মনোযোগ এখন ইশতেহার বাস্তবায়ন ও ‘Governance’ বা সরকার পরিচালনার দিকে।” ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৭ সালের আগে মূল দলের বড় কোনো কাউন্সিল হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
ঈদের পর ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল এবং কৃষক দল দিয়ে যে পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে, তার ঢেউ শেষ পর্যন্ত কতটা সফলভাবে তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।