তৃণমূলে স্থবিরতা, নেতৃত্বে অচলাবস্থা দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলেও সাংগঠনিকভাবে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (BNP)। দলের ১১টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের মধ্যে ১০টিরই কমিটির মেয়াদ বহু আগে শেষ হয়ে গেছে। কোনো কোনো সংগঠনের নেতৃত্ব পরিবর্তন হয়নি এক যুগেরও বেশি সময় ধরে। নিয়মিত কাউন্সিল (Council) না হওয়ায় এবং পদপ্রত্যাশীদের মূল্যায়ন না মেলায় নিচতলার কর্মীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। এই সাংগঠনিক স্থবিরতা কাটাতে এবং নতুন নেতৃত্ব (New Leadership) তৈরির লক্ষ্যে পবিত্র ঈদুল ফিতরের পরপরই বড় ধরনের পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু করতে যাচ্ছে দলটি।
তারেক রহমানের কড়া বার্তা ও ‘মিশন পুনর্গঠন’ দলীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাঁর তেজগাঁও কার্যালয়ে রাজনৈতিক উপদেষ্টাদের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসেন। ওই বৈঠকে উপদেষ্টারা অঙ্গ-সংগঠনগুলোর নাজুক চিত্র তুলে ধরেন। বিশেষ করে মাঠ পর্যায়ে সংগঠনের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়লে তা সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে সতর্ক করা হয়। সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনার পর তারেক রহমান ঈদের পর থেকেই ‘শুদ্ধি অভিযান’ বা পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরুর সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। লক্ষ্য একটাই—আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে (Local Government Election) জয় নিশ্চিত করতে এবং দলের অভ্যন্তরে গতিশীলতা ফেরাতে যোগ্য ও ত্যাগী নেতাদের সামনে আনা।
ছাত্রদল দিয়েই শুরু হচ্ছে নতুন যাত্রা বিএনপির নীতি-নির্ধারণী মহলের পরিকল্পনা অনুযায়ী, পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার আনুষ্ঠানিক সূচনা হবে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল দিয়ে। রাকিবুল ইসলাম ও নাছির উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন বর্তমান কমিটির মেয়াদ গত ১ মার্চ শেষ হয়েছে। অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং বিগত আন্দোলনে প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে না পারার অভিযোগে এই কমিটি ভেঙে দেওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। এরই মধ্যে পদপ্রত্যাশীদের মধ্যে লবিং ও দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে। ছাত্রদলের পরবর্তী কমিটিতে ‘ভ্যানগার্ড’ হিসেবে কাজ করতে সক্ষম এমন নেতৃত্ব খুঁজছে দল। তবে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট (Syndicate) ও বাইরের মহলের হস্তক্ষেপ নিয়ে সাধারণ কর্মীদের মধ্যে এক ধরনের উদ্বেগও রয়েছে।
স্বেচ্ছাসেবক ও যুবদলের চিত্র: মন্ত্রী-এমপিদের দ্বৈত ভূমিকা ২০২২ সালে গঠিত স্বেচ্ছাসেবক দলের কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। বর্তমান কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক দুজনেই সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন; এমনকি সাধারণ সম্পাদক রাজীব আহসান নতুন সরকারের প্রতিমন্ত্রীর (Minister of State) দায়িত্বও পেয়েছেন। একই অবস্থা যুবদলের ক্ষেত্রেও। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন বর্তমানে সংসদ সদস্য। নিয়ম অনুযায়ী, গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে সংগঠনের পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব পালন করা কঠিন হওয়ায় এসব সংগঠনে দ্রুত নতুন কমিটি দেওয়ার জোর গুঞ্জন উঠেছে। অন্যদিকে কৃষক দলের কমিটির মেয়াদ দেড় বছর আগেই ফুরিয়ে গেছে, যেখানে শীর্ষ নেতাদের নিয়ে খোদ দলের ভেতরেই নানা বিতর্ক রয়েছে।
মহিলা দল ও শ্রমিক দল: এক যুগ ধরে একই কক্ষপথে বিএনপির সবচেয়ে জরাজীর্ণ অবস্থা বিরাজ করছে মহিলা দল ও শ্রমিক দলে। ২০১৬ সালে গঠিত মহিলা দলের কমিটি ১০ বছর ধরে একই অবস্থায় রয়েছে, যেখানে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দ্বন্দ্ব এখন ‘ওপেন সিক্রেট’। শ্রমিক দলের অবস্থা আরও করুণ; ২০১৪ সালে গঠিত কমিটি এক যুগ পার করলেও কোনো কাউন্সিল করতে পারেনি। ৫ আগস্টের পর শ্রমিক দলের নেতাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির (Extortion) অভিযোগ ওঠায় ভাবমূর্তি সংকটে পড়েছে মূল দলও। জাসাস (JASAS) এবং মুক্তিযোদ্ধা দলের কার্যক্রমও কেবল দিবসভিত্তিক কর্মসূচিতেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
মূল দলের কাউন্সিল এবং ২০২৭-এর টার্গেট সহযোগী সংগঠনগুলো পুনর্গঠনের তোড়জোড় থাকলেও বিএনপির মূল দলের জাতীয় কাউন্সিল নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি। ২০১৬ সালের পর আর কোনো কাউন্সিল হয়নি। তবে দলের নীতিনির্ধারকদের দাবি, এখন সরকারের ইশতেহার বাস্তবায়ন এবং রাষ্ট্র পরিচালনা (State Governance) করাই তাদের জন্য সবচেয়ে বড় প্রায়োরিটি (Priority)। স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন জানিয়েছেন, আপাতত সরকার পরিচালনার দিকেই সবার নজর। পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে ২০২৭ সাল নাগাদ বিএনপির পরবর্তী জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হতে পারে। তবে তার আগেই শূন্য পদগুলো পূরণের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় কমিটিতে নতুন রক্ত সঞ্চালনের পরিকল্পনা রয়েছে হাইকমান্ডের।