• জাতীয়
  • উৎসবের আলোয় ম্লান একাকীত্বের ছায়া: প্রবীণ নিবাসের নিভৃত কোণে কাটল বিষণ্ন এক ঈদ

উৎসবের আলোয় ম্লান একাকীত্বের ছায়া: প্রবীণ নিবাসের নিভৃত কোণে কাটল বিষণ্ন এক ঈদ

জাতীয় ১ মিনিট পড়া
উৎসবের আলোয় ম্লান একাকীত্বের ছায়া: প্রবীণ নিবাসের নিভৃত কোণে কাটল বিষণ্ন এক ঈদ

আগারগাঁওয়ের প্রবীণ হিতৈষী সংঘে সলিমুল্লাহ খন্দকারদের রিক্ততা; যেখানে পার্থিব সচ্ছলতা আর জৌলুস থাকলেও নেই শুধু আপনজনের স্পর্শ।

নীরবতার আড়ালে জমাটবদ্ধ হাহাকার রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরাবিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান। বাইরে যখন ঈদের আনন্দ-কোলাহল, তখন এই ভবনের সিঁড়ি আর করিডোরে কেবলই সুনসান নীরবতা। পঞ্চম তলার একটি ছোট কক্ষে প্রবেশ করতেই দেখা গেল ষাটোর্ধ্ব এক বৃদ্ধের জীবনসংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। একদিকে পরিপাটি করে সাজানো বইয়ের সারি ও দৈনিক পত্রিকা, অন্যদিকে ডিজিটাল যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ল্যাপটপ-ইন্টারনেটের মাধ্যমে দেশ-বিদেশের খবর রাখা। কিন্তু এই বাহ্যিক ব্যস্ততার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর নিঃসঙ্গতা, যা মাঝেমধ্যেই অশ্রু হয়ে ঝরে পড়ে।

সব থেকেও রিক্ত সলিমুল্লাহ খন্দকারের যাপিত জীবন সলিমুল্লাহ খন্দকার, পেশাগত জীবনে এক সময় ব্যস্ত ছিলেন বেসরকারি চাকরিতে। ২০১৮ সালে Retirement-এর পর জীবনের পট পরিবর্তন হতে শুরু করে। দুই ছেলেই সমাজে প্রতিষ্ঠিত, বড় কোম্পানিতে উচ্চপদে কর্মরত। অথচ জীবনের এই শেষ লগ্নে এসে ৬৮ বছর বয়সী সলিমুল্লাহর ঠিকানা হয়েছে প্রবীণ নিবাস। এক বছর তিন মাস ধরে এখানে কাটছে তার দিনরাত্রি। সন্তানরা মাঝেসাঝে দেখা করতে এলেও, তাকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার কোনো তাগিদ দেখান না। সলিমুল্লাহর ভাষায়, "সব থেকেও আসলে আমার কিছুই নেই।"

উৎসবের আয়োজন বনাম মানসিক নিঃসঙ্গতা (Emotional Isolation) ঈদের দিনটিকে আনন্দময় করতে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। মেন্যুতে ছিল ভুনা খিচুড়ি, পোলাও, মুরগির রোস্ট ও খাসির মাংসের মতো আভিজাত্যপূর্ণ খাবার। কিন্তু সলিমুল্লাহর কাছে এই খাবারের স্বাদ ফিকে হয়ে গেছে পরিবারের সান্নিধ্য না থাকায়। তিনি বলেন, "আগে নিজের বাসায় একা থাকলেও মনে হতো আপনজনের আশপাশেই আছি। এখন সার্বক্ষণিক মনে হয় আমি এক বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দা। এই বাস্তবতা মেনে নেওয়া কঠিন।" শৈশবের দারিদ্র্যমাখা ঈদে গুড়ের সেমাইয়ের যে স্বাদ তিনি পেতেন, আজ এই বিলাসী আয়োজনেও তা অনুপস্থিত।

মৃত্যুর প্রতীক্ষায় প্রহর গোনা সলিমুল্লাহ খন্দকারের মতে, বৃদ্ধাশ্রমে আসা মানেই হচ্ছে মৃত্যুর জন্য নিঃশব্দ অপেক্ষা। তিনি মনে করেন, পরিবারের সঙ্গে থাকতে পারলে হয়তো আরও কিছুদিন বেশি বাঁচার উদ্দীপনা পেতেন। এখানে তার মূল কাজ কেবল সময় পার করা—কখনও বই পড়ে, কখনওবা ইন্টারনেটে খবর দেখে। জীবনের ভুল সিদ্ধান্তের মাশুল দিচ্ছেন উল্লেখ করে তিনি এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, "আমি চাই না আর কেউ যেন কোনোদিন বৃদ্ধাশ্রমে আসতে বাধ্য হয়। এখানে থাকা মানেই হচ্ছে মৃত্যুটা খুব কাছাকাছি চলে আসা।" তার একমাত্র চাওয়া এখন—সুস্থ অবস্থায় যেন পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে পারেন।

আভিজাত্যের আড়ালে অদৃশ্য দীর্ঘশ্বাস সলিমুল্লাহর গল্পের মতো এই নিবাসে আরও অনেকের গল্প একই সুতোয় গাঁথা। সত্তরোর্ধ্ব এক নারী, যার দুই ছেলেই সপরিবারে যুক্তরাজ্যে স্থায়ী হয়েছেন। তারা নিয়মিত Remittance এবং মায়ের থাকার খরচ পাঠালেও, গত ১০ বছর ধরে মায়ের জন্য পাঠাননি কোনো ভালোবাসার ছোঁয়া। নিঃসঙ্গতাকে সঙ্গী করেই অভ্যস্ত হয়ে গেছেন তিনি।

অন্যদিকে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী আইনজীবীর গল্পটি কিছুটা ভিন্ন। স্বামী নেই, নেই কোনো সন্তান। এক সময় সরকারি দায়িত্ব পালন করেছেন নিষ্ঠার সঙ্গে, এখনো প্রবীণ নিবাসে থেকেই নিয়মিত আদালতে আইন পেশায় সময় দিচ্ছেন। তার মতে, এখানে যারা আছেন তারা সবাই আর্থিকভাবে অত্যন্ত সচ্ছল। কিন্তু পারিবারিক জটিলতা আর একাকীত্ব তাদের বাধ্য করেছে এই নিবাসকে শেষ আশ্রয় হিসেবে বেছে নিতে।

একবিংশ শতাব্দীর এই যান্ত্রিক যুগে Lifestyle-এর পরিবর্তন আর পারিবারিক কাঠামোর ভাঙন আমাদের প্রবীণদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, সলিমুল্লাহ খন্দকারদের এই নিঃশব্দ ঈদ পালন যেন সমাজের বিবেককে সেই প্রশ্নই করে গেল।

Tags: mental health loneliness dhaka news social issues eid celebration old age probin nibash retirement life family bond aging parents