সারা দেশে যখন পবিত্র ঈদুল ফিতরের আনন্দ ও উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে, ঠিক তখনই চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে নেমে এল শোকের ছায়া। চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলায় এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন মোহাম্মদ কাশেম (৩৫) নামের এক ব্যক্তি। শনিবার (২১ মার্চ) দুপুর ১২টার দিকে পটিয়া বাইপাসের পাইকপাড়া পয়েন্টে যাত্রীবাহী একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে গেলে এই দুর্ঘটনা ঘটে। এতে শিশু ও নারীসহ অন্তত ২৫ জন যাত্রী কমবেশি আহত হয়েছেন।
দুর্ঘটনার নেপথ্যে: পথচারীকে বাঁচাতে গিয়েই বিপত্তি
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম থেকে পর্যটন শহর কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসা ‘হানিফ পরিবহন’-এর একটি দ্রুতগামী বাস পটিয়া বাইপাস এলাকায় পৌঁছালে আকস্মিকভাবে এক পথচারী সামনে চলে আসেন। চালক ওই পথচারীকে রক্ষা করার জন্য হার্ড ব্রেক (Hard Brake) চেপে বাসটি ডানে সরিয়ে নেন। এতে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার মাঝখানের ডিভাইডারের (Divider) ওপর উঠে যায় এবং মুহূর্তেই উল্টে পড়ে। ঘটনাস্থলেই বাসের নিচে চাপা পড়ে কাশেম নামের ওই ব্যক্তির মৃত্যু হয়।
তৎপর উদ্ধার অভিযান ও আহতদের আর্তনাদ
দুর্ঘটনার খবর পাওয়া মাত্রই পটিয়া ফায়ার সার্ভিসের একটি চৌকস দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে ‘ইমার্জেন্সি রেসপন্স’ (Emergency Response) শুরু করে। বাসের জানালার কাঁচ ভেঙে এবং ভেতর থেকে আটকে পড়া যাত্রীদের উদ্ধার করা হয়। আহতদের মধ্যে ৭ মাসের শিশু থেকে শুরু করে ৬০ বছরের বৃদ্ধও রয়েছেন।
আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে ৪ জনের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাদের দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (CMCH) স্থানান্তর করা হয়েছে। আহতদের তালিকায় রয়েছেন— আবুল কাসেম (৬০), আবু হানিফ (৩৮), সিরাজুল হক (১৪), মহিসোনা (৭ মাস), প্রান্ত শীল (১৭), দহান (১৭), আদিত্য বিশ্বাস (১৩), মিনাক্ষী (৩৮), জান্নাতুল ফেরদৌস (৩৫), তাসপিয়া (৭), আবদুর রহিম (৯), মো. ইব্রাহিম (৫৫), প্রবীর শীল (৪২), শারমিন সুলতানা (২৫), সুলতানা রাজিয়া (৫১), আক্তার বেগম (৫৫), ওয়াজিদা (৯), সোবাইকা জান্নাত (৯) ও ইউনুচ (৩৮)।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্য
পটিয়া ক্রসিং হাইওয়ে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (OC) মো. হারুনুর রশিদ দুর্ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, "ঈদের ছুটির কারণে মহাসড়কে যানবাহনের চাপ কিছুটা ভিন্ন থাকলেও দুর্ঘটনাটি ঘটেছে মূলত এক পথচারীকে বাঁচাতে গিয়ে। বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ডিভাইডারে ধাক্কা খেয়ে উল্টে যাওয়ায় হতাহতের সংখ্যা বেড়েছে। আমরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে ঘাতক বাসটি উদ্ধারের প্রক্রিয়া শুরু করেছি এবং যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে কাজ করছি।"
উৎসবের দিনে শোকের আবহ
ঈদের দিনে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় নিহত কাশেমের পরিবারে চলছে শোকের মাতম। অন্যদিকে, যারা আহত হয়েছেন তাদের অনেকেরই গন্তব্য ছিল কক্সবাজারের সৈকতে ঈদের ছুটি কাটানো। কিন্তু এক নিমেষের দুর্ঘটনা তাদের পর্যটন পরিকল্পনাকে বিষাদে পরিণত করেছে। স্থানীয়রা বলছেন, মহাসড়কের এই বাইপাস (Bypass) পয়েন্টে ট্রাফিক সিগন্যাল বা গতিরোধকের অভাব থাকায় মাঝেমধ্যেই এমন দুর্ঘটনা ঘটছে।
পটিয়া হাইওয়ে পুলিশ জানিয়েছে, নিহতের মরদেহ আইনি প্রক্রিয়া শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে এবং দুর্ঘটনাকবলিত বাসটি বর্তমানে পুলিশ হেফাজতে রয়েছে।